একীভূত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বহু আমানতকারী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের পর একীভূত হওয়া কয়েকটি ব্যাংক লিখিতভাবে তাদের আপত্তির কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অবহেলা এবং অনিয়মের কারণে যে অর্থ আত্মসাৎ ও লোকসান হয়েছে তার দায় আমানতকারীদের ওপর চাপানো হচ্ছে। বিষয়টি শরিয়াহসম্মত কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, বিষয়টি সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ডে আলোচিত হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সরকার গঠন করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। বিপরীতে বিতরণ করা এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকার ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের দুই বছরের মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক, শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আরেকটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং একজন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা সবাই মত দেন, শরিয়াহ মানদণ্ড অনুযায়ী আমানতকারীদের মুনাফা না দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবেচনাধীন থাকায় কেউই নাম প্রকাশে আগ্রহী হননি। (সূত্র: সমকাল )
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, গত সপ্তাহে দেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। গত ১৪ জানুয়ারি সব ব্যাংকের প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব আমানতের ক্ষেত্রে কোনো মুনাফা প্রযোজ্য হবে না।
ইসলামী ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো সঞ্চয়ী ও মেয়াদি আমানত গ্রহণ করে ‘মুদারাবা’ পদ্ধতিতে। আর চলতি হিসাব পরিচালিত হয় ‘আল-ওয়াদিয়াহ’ পদ্ধতিতে। মুদারাবা পদ্ধতিতে আমানতকারী ‘সাহিব-আল-মাল’ অর্থাৎ মূলধন সরবরাহকারী। ব্যাংক এখানে ‘মুদারিব’ বা ব্যবস্থাপক। আমানত গ্রহণের সময় মুনাফা বণ্টনের হার চুক্তিতে নির্ধারিত থাকে। স্বাভাবিক ব্যবসায় লোকসান হলে আমানতকারীকে লোকসানের অংশ নিতে হয়। তবে ব্যাংকের অবহেলা, অসদাচরণ বা বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে লোকসান হলে পুরো দায় ব্যাংকের ওপর বর্তায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো বাহরাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন্স (আওফি)–এর শরিয়াহ মানদণ্ড অনুসরণ করে।
আওফির মানদণ্ড অনুযায়ী, মুদারাবা চুক্তি একটি ট্রাস্টভিত্তিক চুক্তি। স্বাভাবিক লোকসানে ব্যাংক দায়ী না হলেও তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম, অবহেলা বা চুক্তি লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে ব্যাংককেই পুরো মূলধনের দায় নিতে হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ডের সদস্য ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী বলেন, বিষয়টি নিয়ে বোর্ডে আলোচনা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত মতামত দিতে আরও দুই-তিন দিন সময় লাগবে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখানে শরিয়াহর একাধিক দিক জড়িত থাকায় সমাধানে একটু সময় লাগছে।

