রাষ্ট্র মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে সরকার বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) একীভূত করার চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একটি ধারণাপত্র (কনসেপ্ট পেপার) তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। এতে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) এর আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ, মূলধন পরিস্থিতি ও নগদ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক সভায় জানান, ৯ অক্টোবরের এক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ কমানোর অগ্রগতি মূল্যায়ন করতেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মূলধন ও খেলাপি ঋণের বাস্তব চিত্র:
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এসব রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি ভালো নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ গত সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৪৮.৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ছিল ১৮ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের অবস্থাও অনুরূপ। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ২০ শতাংশ খেলাপি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে মূলধন ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা।
আমানত ও ঋণ বিতরণ:
সভায় বলা হয়, ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তপশিলি ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহে সফল হয়েছে। তবে বিএইচবিএফসি, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আমানত সংগ্রহে ব্যর্থ।
ঋণ বিতরণে গত তিন অর্থবছরে সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ বিতরণ তুলনায় বেশি, যা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি সঠিক গ্রাহক নির্বাচন করে নিরাপদ ঋণ বিতানের ওপর গুরুত্ব দেন।
মূলধন ঘাটতি ও ব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গি:
মূলধন পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, আগে ব্যাংকের প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পুনঃতপশিলকৃত ঋণ ছিল, যা এখন শ্রেণীকৃত ঋণে রূপান্তর করা হয়েছে। প্রভিশন সংরক্ষণের কারণে মূলধন ঘাটতি আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিনিধিরা জানান, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কম সুদে প্রকল্প ঋণ বা আমানত পেলে মূলধন পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক হবে। অন্যদিকে কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক ও বিএইচবিএফসির মূলধন পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক।
কৃষি, পল্লী ও সিএমএসএমই ঋণ:
কৃষি ও পল্লী ঋণ খাতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের অর্জন সন্তোষজনক। তবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।
সিএমএসএমই খাতে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের পারফরম্যান্স তুলনামূলক ভালো। ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সিএমএসএমই ঋণগ্রহীতারা সাধারণত ইচ্ছাকৃত খেলাপি হন না। তাই এই খাতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে আরও উদ্যোগী হতে হবে।
খেলাপি ঋণ ও নগদ আদায়:
সভায় জানানো হয়, খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকে। বিএইচবিএফসি ও কর্মসংস্থান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সীমার মধ্যে থাকলেও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে। নগদ আদায় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে কিছুটা বেড়েছে। তবে অবলোপন করা ঋণ থেকে নগদ আদায় এখনও সন্তোষজনক নয়।
ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের কার্যক্রম আরও গতিশীল, জনবান্ধব ও কার্যকর করতে একীভূতকরণ বা বিভাগভিত্তিক কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য ধারণাপত্র তৈরি করতে হবে। একই গ্রাহক যেন একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ না নিতে পারে, সে জন্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলোর সমন্বয় জোরদার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কম সুদে আমানত সংগ্রহ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ বিতরণ জোরদার করা, খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ে আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ ও নিয়মিত তদারকি করা এবং ঋণ সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলোর আইন বিভাগ শক্তিশালী করা হবে।

