প্রযুক্তির সহায়তায় এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। শহর হোক বা গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল, মানুষ এখন নিমেষেই টাকা জমা দিতে, উত্তোলন করতে এবং প্রবাসী আয়ের রেমিট্যান্স পেতে পারছেন। প্রচলিত ব্যাংক শাখার মতো প্রায় সব ধরনের সেবা পাওয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকের প্রায় ৮৭ শতাংশই পল্লি অঞ্চলের। এ মাধ্যমে বার্ষিক লেনদেন ৩৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় এজেন্ট ব্যাংকিং এখন দেশের প্রান্তিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০টি ব্যাংকের ১৫ হাজার ৩২১ জন এজেন্ট ২০ হাজার ৪৪৮টি আউটলেটের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। খোলা হিসাবের সংখ্যা ২ কোটি ৫১ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রাহক গ্রামীণ এবং প্রায় অর্ধেক হিসাব নারীদের নামে। গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশের এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবের আমানত স্থিতি ছিল প্রায় ৪৭ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। এর ৩৯ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা গ্রাম ও প্রান্তিক জনপদ থেকে এসেছে, যা মোট আমানতের প্রায় ৮৩ শতাংশ।
ঋণের দিক থেকেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অবদান চোখে পড়ার মতো। একই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। এর বড় অংশই ব্যবহার হচ্ছে কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে। গ্রামীণ এলাকার কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরদের জন্য সহজে আর্থিক সেবা নিশ্চিত হওয়ায় ব্যাংকে যেতে সময় ও খরচ দুইই কমেছে। ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় দোকান বা আউটলেট থেকেই টাকা জমা, উত্তোলন, বিল পরিশোধ এবং ঋণ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগে ব্যবহার হচ্ছে। প্রায় ২ কোটি ১৪ লাখ গ্রামীণ হিসাবধারী সরাসরি এই সেবার আওতায় এসেছেন। এতে তারা দাদন বা উচ্চ সুদে ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্তি পাচ্ছেন। ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের অবকাঠামো শক্তিশালী করছে। এটি ভবিষ্যতে কৃষি ঋণের প্রবাহ আরও বাড়াবে।
নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৮টি ব্যাংক ১ হাজার ৪৬২ জন নারী মালিকানাধীন এজেন্টের মাধ্যমে ১ হাজার ৭৩৪টি আউটলেটে সেবা দিচ্ছে। এসব আউটলেট থেকে ১৯ লাখের বেশি হিসাব খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী আউটলেট স্থাপনে ১ অনুপাত ১ বজায় রাখার উদ্যোগ ভবিষ্যতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াবে।
প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিং অন্যতম বড় চ্যানেল হয়ে উঠেছে। গ্রাহকের দোরগোড়ায় দ্রুত ও সহজে টাকা পৌঁছে দেওয়ার কারণে এই মাধ্যম দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে বিতরণ করা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এটি ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এই অর্থ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়ে স্থানীয় বাজার, কৃষি উৎপাদন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন গতি সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এজেন্ট ব্যাংকিং শুধুমাত্র ব্যাংকিং সেবার পরিসর বাড়াচ্ছে না। এটি কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখছে। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এজেন্ট ব্যাংকিং ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

