এক সময় ব্যাংকিং মানেই ছিল শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ঝক্কি। কিন্তু এখন সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই আউটলেটে চলছে সকল ধরনের আর্থিক লেনদেন। এই নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লবের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি।
ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খাঁনের দূরদর্শী নেতৃত্বে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং মডেলটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৮৬ সালে এই ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করা ওমর ফারুক খান ৩৭ বছরের অভিজ্ঞতার ব্যাংকার। সম্প্রতি তিনি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সম্ভাবনা, সাফল্য এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ নিয়ে কালবেলার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তার ভাষায় উঠে এসেছে একটি অনন্য রূপান্তরের গল্প।
ওমর ফারুক খাঁনের মতে, ইসলামী ব্যাংকের জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং এখন একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও কৌশলগত বিনিয়োগ। পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপনের তুলনায় এজেন্ট আউটলেট পরিচালনার খরচ কম হওয়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সহজেই হাজারো আউটলেটের মাধ্যমে সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব। গ্রামের সাধারণ মানুষের ছোট ছোট সঞ্চয়ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসা যায়। এর ফলে ব্যাংকের তহবিলের খরচ কমে এসএমই বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়ছে।
একই সঙ্গে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স সরাসরি গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে ইসলামী ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও শক্তিশালী করছে। আগে যারা কখনো ব্যাংকিং সেবার আওতায় ছিলেন না, তাদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতের বিশ্বস্ত গ্রাহক তৈরি হচ্ছে। মূলত গ্রাহকদের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা বাড়ানোই এই দীর্ঘমেয়াদি ‘কাস্টমার ইক্যুইজিশন’ স্ট্র্যাটেজির লক্ষ্য। আজকের ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী ভবিষ্যতে বিনিয়োগের গ্রাহক হিসেবে ব্যাংকের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। এই মডেলটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খান বলেন, ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে সাভারের বিরুলিয়া থেকে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে শুরু হয় এ কার্যক্রম। গ্রাহকদের সুবিধা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে নেওয়া এই পদক্ষেপ দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন দিগন্ত খুলেছে।
তিনি জানান, এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে, যেখানে ব্যাংকের শাখা নেই, সেখানে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মৌলিক ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে টাকা জমা ও উত্তোলন, ফান্ড ট্রান্সফার, বিল পরিশোধ, স্কুল ও কলেজের বেতন পরিশোধ এবং রেমিট্যান্স সেবা। এছাড়া, দেশের সাধারণ মানুষকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা এবং শরিয়াহভিত্তিক সুদমুক্ত নিরাপদ ব্যাংকিং সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়া এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
ওমর ফারুক খান আরও বলেন, ২০১৭ সাল থেকে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও ইসলামী ব্যাংকের সেবা গ্রহণ করতে পারছে। মূলত ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্যই এই কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের ব্যাংকিং সুবিধা গ্রাহকের হাতের নাগালে পৌঁছাচ্ছে। ফলে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এই নতুন ব্যাংকিং ধারা।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক সেবা যেমন সেলফিন অ্যাপ ও বায়োমেট্রিক ব্যবহার করে গ্রাহকের আস্থা অর্জন সম্ভব হচ্ছে। প্রান্তিক মানুষজন এখন সহজে এবং নিরাপদে টাকা জমা-উত্তোলন, রেমিট্যান্স গ্রহণ ও বিল পরিশোধের মতো সেবা পাচ্ছেন। এ কারণে এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করছে এবং দিন দিন আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কভিড মহামারির সময় থেকে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খান জানান, এই সেবা দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক দেশব্যাপী ২ হাজার ৮০০টির বেশি এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে ৪৭৭টি উপজেলায় আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে। আস্থা ও গ্রাহক সন্তুষ্টির কারণে এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
ওমর ফারুক খান বলেন, গ্রাহক আস্থা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি। গত এক বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ব্যাংক সচেতনভাবে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষকে ব্যাংকিং পরিষেবার আওতায় আনতে মনোযোগ দিয়েছে। তাই ৯৪ শতাংশ এজেন্ট আউটলেট প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত, যা দেশের গ্রামীণ ও শহরের অনুপাতের তুলনায় অনেক বেশি।
এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ এবং নতুন গ্রাহক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষকে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ায় এটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম চালু হওয়ার পর এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৫৮ লাখে পৌঁছেছে। ইসলামী ব্যাংক স্থানীয় সৎ ও দক্ষ উদ্যোক্তাদের বাছাই করে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়, যা গ্রাহকদের আস্থা বাড়াচ্ছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমে কৃষক, নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সেবা রয়েছে। কৃষকরা মাত্র ১০ টাকায় অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন এবং ১০০ টাকায় মুদারাবা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকাউন্ট খোলা যাচ্ছে। কৃষি উপকরণ ক্রয়ের জন্য সহজ শর্তে বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়া হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ব্যবসা বিনিয়োগ (SBIS) এবং পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (RDS) মাধ্যমে সহায়তা করা হয়। সরকারি কৃষি ভর্তুকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর টাকা সহজে উত্তোলন করা সম্ভব। মূল লক্ষ্য শহর ও গ্রামের ব্যবধান কমিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন।
মাঠ পর্যায়ে এজেন্টদের দক্ষতা ও সেবার মান নিশ্চিত করতে প্রতিটি আউটলেটকে নিয়ন্ত্রণকারী শাখার প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শাখার কর্মকর্তা নিয়মিত আউটলেট পরিদর্শন করে লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং দাপ্তরিক নথি যাচাই করেন। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রধান কার্যালয় অফসাইট সুপারভিশনের মাধ্যমে মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করে। এছাড়া ব্যাংকের অডিট টিম আকস্মিক পরিদর্শন করে সেবার মান ও নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে।
ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে এজেন্টদের পেশাদারিত্ব বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খান জানান, গ্রাহকদের জন্য ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন চালু আছে। প্রযুক্তিগত সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক নজরদারির সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও জালিয়াতি রোধে এজেন্ট আউটলেটে লেনদেন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। গ্রাহকের আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) ব্যবহার করে লেনদেন করা হয়। প্রতিটি লেনদেনের জন্য গ্রাহকের মোবাইলে ওটিপি পাঠানো হয়। গ্রাহক ওটিপি দিলে লেনদেন সম্পন্ন হলে বিবরণী এসএমএসের মাধ্যমে পাঠানো হয়। বড় লেনদেনে দুইজন এজেন্ট কর্মকর্তার অনুমোদন লাগে। গ্রাহক ০৯১৭৫১৬২৫৯ নম্বরে মিসড কল দিয়ে বিনা খরচে ব্যালেন্স জানতে পারেন। এছাড়া প্রতিটি আউটলেটে লেনদেন পদ্ধতি পোস্টার এবং মৌখিক নির্দেশনার মাধ্যমে গ্রাহককে সচেতন করা হয়। বিভিন্ন সময়ে এজেন্ট ও গ্রাহককে নিয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়।
এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ওমর ফারুক খান উল্লেখ করেন তৃণমূল পর্যায়ে দক্ষ ও সৎ মানবসম্পদ নিশ্চিত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ বজায় রাখা। এছাড়া প্রান্তিক গ্রাহকদের সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতার অভাব এবং নগদ টাকার তাৎক্ষণিক সংকুলানও বড় চ্যালেঞ্জ।
নীতিমালার সংস্কার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তিনি বলেন, এজেন্ট আউটলেটের লেনদেন সীমা বৃদ্ধি, এজেন্ট মালিকের মৃত্যু বা নিখোঁজ হলে দ্রুত অনুমোদন, অনৈতিক কার্যক্রমে আউটলেট বাতিলের ধারা সংযোজন, ক্ষুদ্র বিনিয়োগ বিতরণ সহজ করা এবং আউটলেট থেকে বীমা বা সরকারি ফি সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি করা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো খাতকে আরও গতিশীল করতে সহায়ক হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি হিসাব খোলা এবং ৬০ হাজার কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। ব্যাংকের নিজস্ব জনশক্তি নিয়োগের মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা আছে। গ্রাহকসেবা উন্নত করে রেমিট্যান্স প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করার পাশাপাশি প্রবাসী গ্রাহকসেবা শক্তিশালী করা হবে।
তরুণ উদ্যোক্তা ও গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নিরাপদ শরিয়াহভিত্তিক লেনদেন ও হাজারো তরুণের স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে আমরা পৌঁছেছি আপনার দোরগোড়ায়। আধুনিক ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরে বসেই স্বচ্ছ ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষিত তরুণরা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে এজেন্ট আউটলেটের উদ্যোক্তা হয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অবদান রাখুক এবং ব্যাংকের অংশীদার হিসেবে গড়ে উঠুক—এটাই ব্যাংকের মূল লক্ষ্য।
প্রান্তিক এলাকায় আমানত ও বিনিয়োগ সেবা পৌঁছে দিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া এবং প্রতিটি জনপদে সুদমুক্ত ব্যাংকিং পৌঁছে দেওয়া ইসলামী ব্যাংকের দর্শন। আস্থা, নিরাপত্তা ও সততার এই সেতুবন্ধনে ব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

