প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ব্যাংক খাতকে আরও দক্ষ, নিরাপদ ও গ্রাহককেন্দ্রিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডিজিটাল রূপান্তরের এই সময়ে আধুনিক প্রশিক্ষণ ছাড়া টেকসই ব্যাংকিং সম্ভব নয়। এমন মত দিয়েছেন ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা।
শনিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) জাতীয় প্রশিক্ষণ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তারা এসব কথা বলেন।
বক্তারা বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং, ফিনটেক উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে ব্যাংকগুলো এখন প্রশিক্ষণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যাংক কর্মকর্তারা কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ব্লকচেইন অ্যাপ্লিকেশন এবং রেগুলেটরি টেকনোলজি বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করছেন।
তারা জানান, এ ধরনের প্রশিক্ষণ ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে যেমন গতিশীল করছে, তেমনি পরিবর্তনশীল নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে সিমুলেশনভিত্তিক শিক্ষা, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম এবং ডেটানির্ভর কেস স্টাডি প্রশিক্ষণকে আরও সহজ, নমনীয় ও কার্যকর করে তুলছে।
জাতীয় প্রশিক্ষণ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বিআইবিএম ক্যাম্পাসে দিনব্যাপী কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। জাতীয় উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরতেই এই আয়োজন করা হয়। সকালে শোভাযাত্রার মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সরকারের সিনিয়র সচিব ও ন্যাশনাল একাডেমি ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের মহাপরিচালক সিদ্দিক জোবায়ের, এনসিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শামসুল আরেফিন এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খান। তারা ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন, নেতৃত্ব ও পেশাদারিত্ব জোরদারে বিআইবিএমের মতো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার। তিনি বলেন, প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ অপরিহার্য। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও প্রণোদনা কার্যকর প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাসেল–৩, আইএফআরএস ও অ্যান্টি-মানি লন্ডারিংসহ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ নিয়ন্ত্রণের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করে এবং ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি ক্যারিয়ার উন্নয়ন, কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি ও দক্ষতাভিত্তিক প্রণোদনা কর্মীদের প্রশিক্ষণে সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে। নিয়মনীতি ও প্রণোদনাভিত্তিক প্রশিক্ষণ একত্রে ব্যাংক খাতে ভবিষ্যৎ-সক্ষম মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সহায়ক।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম সমাপনী বক্তব্যে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও নীতিগত সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং একটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত খাত। তাই ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং বিধিমালা, সার্কুলার ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০২৭ সাল থেকে প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি নিরূপণ ও সংরক্ষণে আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন এবং ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালু হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে বিআইবিএমের অধ্যাপক ও প্রশিক্ষণ পরিচালক ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি আর্থিক খাতের পরিবর্তনশীল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ধারাবাহিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বিআইবিএমের দীর্ঘদিনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া অধ্যাপক ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি উপস্থাপিত ‘বিআইবিএম: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রেজেন্টেশনে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রাপথ, অর্জন এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শীর্ষস্থানীয় প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।

