ব্যাংক খাতের সব ধরনের আর্থিক লেনদেনকে তাৎক্ষণিক স্বয়ংক্রিয় নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে সংঘটিত যেকোনো আর্থিক অপরাধ সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করা যাবে।
বিএফআইইউ জানায়, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বেনামি ঋণ, ঋণের অপব্যবহার, অর্থ পাচার, ঋণপত্র জালিয়াতিসহ সব ধরনের আর্থিক অনিয়ম দ্রুত ধরা পড়বে। পর্যায়ক্রমে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাকেও (এমএফএস) এই নজরদারির আওতায় আনা হবে। এতে দেশের আর্থিক লেনদেন তদারকিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বর্তমানে সন্দেহজনক লেনদেন বা এসটিআর (সাসপিশাস ট্রানজেকশন রিপোর্ট) সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পায় না বিএফআইইউ। পুরো বিষয়টি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রতিবেদনের ওপর। বাণিজ্যের মাধ্যমে সংঘটিত আর্থিক অপরাধের তথ্যও বর্তমান ব্যবস্থায় সংস্থাটির কাছে পৌঁছায় না। এসব সীমাবদ্ধতা কাটাতেই সব লেনদেনকে তাৎক্ষণিক স্বয়ংক্রিয় নজরদারিতে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে প্রো অ্যাকটিভ ট্রানজেকশন মনিটরিং সিস্টেম (পিটিএমএস) বা আগাম সতর্কতামূলক লেনদেন নজরদারি পদ্ধতি। চলতি মাসেই পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু হওয়ার কথা রয়েছে। শুরুতে ১৩টি ব্যাংক এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে সব ব্যাংককে এর আওতায় আনা হবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে ব্যাংক খাতের অপরাধ অনেকটাই কমে যাবে। ব্যাংকার ও গ্রাহক উভয়ই সচেতন হবে। বেনামি ঋণ ও অর্থ পাচার বন্ধ করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে। অনেক দেশ এই পদ্ধতি ব্যবহার করে সুফল পেয়েছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত সেই পথে যেতে হবে।
এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু করতে পারলে ব্যাংক খাতের অপরাধ অনেকাংশে দূর হবে। ব্যাংকারদের পাশাপাশি ব্যাংকের সব গ্রাহক সচেতন হয়ে যাবেন। বেনামি ঋণ, ভুয়া ঋণপত্র ও অর্থ পাচার বন্ধ করা গেলে দেশের অর্থনীতির দ্রুত উন্নতি ঘটবে।
-সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, এমডি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক
সিটিআর–এসটিআর কতটা কার্যকর
বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলন হলে বিএফআইইউতে ক্যাশ ট্রানজেকশন রিপোর্ট (সিটিআর) জমা দিতে হয়। প্রতি মাসের ২২ তারিখে এই প্রতিবেদন দিতে হয়।
এ ছাড়া ব্যাংক নিজে সন্দেহজনক মনে করলে এসটিআর পাঠায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গুরুতর আর্থিক অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য ব্যাংকগুলো পাঠায় না। ফলে অনেক অনিয়ম অদৃশ্য থেকে যায়। এ সুযোগ নেন অসাধু কর্মকর্তা, পরিচালক ও প্রভাবশালীরা। বাণিজ্য বা ঋণের মাধ্যমে অর্থ পাচারের তথ্যও প্রায় অনুপস্থিত থাকে।
বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসটিআরের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বাড়লেও এর ৮০ শতাংশই ছিল সাধারণ ব্যাংকিং লেনদেন–সংক্রান্ত। বাণিজ্য বা ঋণ অনিয়মের অভিযোগ খুবই কম। এতে বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্থ পাচার রোধ কার্যকর হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংস্থার কর্মকর্তারা।
যেভাবে কাজ করবে পিটিএমএস
পিটিএমএসের মাধ্যমে প্রতিটি ব্যাংক লেনদেনের উৎস ও গন্তব্য বিশ্লেষণ করা হবে। হিসাবের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ লেনদেন হলেই স্বয়ংক্রিয় সতর্কসংকেত তৈরি হবে। এই সংকেত একসঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা, প্রধান কার্যালয় ও বিএফআইইউতে পৌঁছাবে। বড় অঙ্কের অস্বাভাবিক লেনদেনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
ব্যাংকগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে নতুন নির্ণায়ক তৈরি করেছে বিএফআইইউ। এর মধ্যে সাধারণ ব্যাংকিং–সংক্রান্ত ২৯টি, ঋণ–সংক্রান্ত ৬৭টি, বৈদেশিক বাণিজ্য–সংক্রান্ত ৭৭টি এবং প্রবাসী আয়–সংক্রান্ত ৮টি নির্ণায়ক রয়েছে। শুরুতে প্রবাসী আয় নজরদারির বাইরে থাকবে।
ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে অর্থ পাচার প্রতিরোধ সফটওয়্যারে এসব নির্ণায়ক যুক্ত করা হবে। প্রয়োজনে নতুন ধরনের অপরাধ শনাক্তে অতিরিক্ত নির্ণায়ক যোগ করার সুযোগও থাকবে।
নিয়ম অনুযায়ী হিসাব খোলার সময় গ্রাহককে আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাত জানাতে হয়। পিটিএমএসে ঋণের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ব্যবহার না হলে সেটিও সতর্কসংকেত হিসেবে ধরা পড়বে। ঋণপত্র খোলার সময় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের সক্ষমতা, সুবিধাভোগীর তথ্য ও অর্থের গতিপথ বিশ্লেষণ করা হবে। অনিয়ম হলে ব্যাংককে তাৎক্ষণিক সমাধান করতে হবে। দায়িত্ব এড়ালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এতে ঋণপত্রের মাধ্যমে অর্থ পাচার শুরুতেই ঠেকানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ উদ্যোগের ফলে সবাই সাবধান হয়ে যাবেন। বড় অঙ্কের লেনদেন কমে যেতে পারে। ভালোভাবে তদারকি হলে ভবিষ্যতে আর্থিক অপরাধ কমে আসবে। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। এ উদ্যোগ দেশের আর্থিক খাতের জন্য ভালো হবে।
-আহসান জামান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক, এবিবি
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও তুরস্ক পিটিএমএস চালুর মাধ্যমে অর্থ পাচার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, কানাডা ও নেদারল্যান্ডসেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও আর্থিক অপরাধ কমবে বলে আশা করছে বিএফআইইউ।
শুরুতে যেসব ব্যাংক যুক্ত হচ্ছে
পরীক্ষামূলকভাবে সোনালী ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক এই ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে। পরীক্ষার পর চলতি বছর সব ব্যাংকে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আহসান জামান চৌধুরী বলেন, এই উদ্যোগে সবাই আরও সতর্ক হবে। বড় অঙ্কের ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন কমবে। সঠিক তদারকি হলে ভবিষ্যতে আর্থিক অপরাধ কমে আসবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।

