ঋণের সুদহার কমানোর ব্যবসায়ী দাবিকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য নীতি সুদহার ১০ শতাংশই রেখেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ গত (২৭ জানুয়ারি) জানুয়ারি–জুন সময়ের জন্য মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট (এমপিএস) অনুমোদন করেছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে আজ ২৯ জানুয়ারি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত রেপো রেট ১০ শতাংশ রাখা হয়েছে। এর কারণ, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৬.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ শতাংশের বেশি হলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য এখনো অনেক উপরে।
আগের নীতিতে বলা হয়েছিল, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় থাকবে। নতুন নীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রেখে ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। বর্তমানে প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশ। সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য ১৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৯ শতাংশ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত বছর থেকে কঠোর মুদ্রানীতি থাকলেও ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেসরকারি খাতে চাহিদা কমে যাওয়ায় ঋণ ও আমানতের সুদহার সামান্য বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে গড় ঋণসুদহার প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি এবং আমানতের সুদহার ৬ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ স্বীকার করেছেন। তবে তিনি জানান, এখনই নীতিগত পরিবর্তনের সময় হয়নি। তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি ১২.৫ শতাংশ থেকে নেমে ৮.৫ শতাংশে এসেছে—এটা অগ্রগতি, কিন্তু যথেষ্ট নয়। আমাদের লক্ষ্য দুই বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতিকে ৩–৪ শতাংশে নামানো। তখন পলিসি রেট স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।” গভর্নর আরও বলেন, “মানুষের মধ্যে দাম বাড়ার মানসিকতা ভাঙতে সময় লাগে। এক্সচেঞ্জ রেট মোটামুটি স্থিতিশীল হলেও অভ্যন্তরীণ চাপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।”
ফরেক্স বাজারে স্থিতিশীলতা:
বাজারে স্থিতিশীলতা বাড়াতে ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিময় হার আরও নমনীয় করার পরিকল্পনা করছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক ডলারও বিক্রি করেনি। বরং এই সময়ে বাজার থেকে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে। এটি গত কয়েক বছরের তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট এখন মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ঘাটতিতে থাকা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টেও এখন উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, “সার্বিক ব্যালেন্স গত বছর ইতিবাচক ছিল, এ বছরও ইতিবাচক ধারায় আছে এবং থাকবে। ফলে রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে।”
গভর্নর জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে এক ডলারও বিক্রি করেনি। বরং ৩.৭ বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আইএমএফ ঋণের প্রেক্ষাপটে এই সময়ে তারা প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে, অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে দ্বিগুণের বেশি ডলার কিনেছে।
আইএমএফ যখন বলেছিল নতুন সরকার গঠনের আগে অর্থ ছাড় করা হবে না, আমরা বলেছিলাম—ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই। আমাদের কোনো সংকট নেই। এখন তাদের অর্থের খুব বেশি প্রয়োজন নেই, আমরা ভালোভাবে চলতে পারছি,” বলেন গভর্নর।
তিনি জানান, চলতি বছরের জুনের মধ্যে রিজার্ভ ৩৫ থেকে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর তা আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। আমদানি ও রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিজার্ভ বৃদ্ধি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। গভর্নর বলেন, “সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে বিদেশি বিনিয়োগের যে অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছিল, তা আমরা থামাতে পেরেছি।”
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। গত বছরের জুনে তা ছিল ২৬.৭ বিলিয়ন। এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল আছে ১২২–১২৩ টাকার মধ্যে। তিনি আরও বলেন, “পুঁজির বহির্প্রবাহ উল্টো দিকে ঘুরেছে। আগে যারা দেশ থেকে টাকা তুলছিল, তারা এখন নতুন বিনিয়োগ নিয়ে দেশে ফিরছে।”

