বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের দুইটি কর্মসূচি একসঙ্গে চলার কারণে ব্যাংকিং মহলে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে মন্ত্রীর সমপর্যায়ের পদমর্যাদা চান। অন্যদিকে দেশের আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন। বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে যখন তিনি দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে এই প্রচারণায় অংশ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
গভর্নরের পদমর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসন:
চার মাস আগে গভর্নর নিজেই সরকারের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের অধ্যাদেশ পাঠান। এতে মূলত দুই প্রস্তাব ছিল—গভর্নরের পদমর্যাদা পূর্ণ মন্ত্রীর সমান করা এবং পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধি কমানো। তবে উপদেষ্টা পরিষদের আপত্তির কারণে এ অধ্যাদেশ এখনো অনুমোদন পায়নি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক বিশেষজ্ঞরা মনে করান, শুধু পদমর্যাদা বা ক্ষমতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ক্ষমতাগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা:
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিকে চিঠি দিয়েছে। এতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রতিটি শাখায় ব্যানার টাঙিয়ে জনগণকে উৎসাহিত করতে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় গভর্নরও সরাসরি ‘হ্যাঁ’ প্রচারণায় অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
গভর্নর বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন, “এটি কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা পরবর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে জনগণের কল্যাণে এই প্রচারণা চালানো হয়েছে। ব্যাংকগুলোও জনগণের কল্যাণে কাজ করে, তাই তাদের সিএসআর ফান্ডের মাধ্যমে এতে অর্থ ব্যয় করা যায়।”
তবে বেশিরভাগ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ মতের সঙ্গে একমত নন। তারা বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগতভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত ছিল। গণভোটে ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের সঙ্গে বিভিন্ন স্বার্থের সংঘাত জড়িয়ে থাকতে পারে, তাই ব্যাংকগুলোর এতে জড়ানো আদর্শগতভাবে যুক্তিসঙ্গত নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যাংকের সিইও জানান, “বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ না মানলে উপায় নেই, কিন্তু এটি ব্যাংকের কাজ নয়।”
স্বায়ত্তশাসন বনাম বাস্তবতা:
গভর্নর পদে থাকা ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করে আসছেন। তবে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা মন্ত্রীর সমান পদমর্যাদা ভোগ করেন। অধ্যাদেশের খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছে সরকারি প্রতিনিধি তিনজন থেকে কমিয়ে একজন করা এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সদস্যদের সংখ্যা ছয়জন করার।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করান, পদমর্যাদা দেয়া স্বাভাবিক হলেও ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গভর্নরের নিজস্ব সিদ্ধান্তে সরকার হস্তক্ষেপ করে না, তবে প্রয়োজনে জবাবদিহি করতে হয়। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, তাই পুরোপুরি স্বাধীন রাখা ঠিক নয়।”
গভর্নরও জানিয়েছেন, আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো আইন সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। চার মাস আগে পাঠানো অধ্যাদেশ এখনও অনুমোদিত হয়নি।
সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলছেন, “পদমর্যাদা বা বেতন বাড়ানো কোনো সমাধান নয়। মূল বিষয় হলো দায়িত্বশীল ও সক্ষমভাবে কাজ করা। অতিরিক্ত স্বাধীনতা স্বৈরাচারী ও ক্ষমতালিপ্ত হওয়ার পথও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও গভর্নরের পদমর্যাদা নিয়ে চলমান বিষয়গুলো শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়। এ নিয়ে যে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে, তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করান, ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার প্রয়োগই মূল চ্যালেঞ্জ।

