দেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আরও সুসংহত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং ঋণগ্রহীতাদের মালিকানা নিশ্চিত করতে ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
নতুন এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারা শুধু গ্রাহক হিসেবেই নয়, ব্যাংকের মালিক হিসেবেও অংশীদার হবেন। গতকাল বুধবার (২৮ জানুয়ারি) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ থেকে এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
৫০০ কোটি টাকার মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক:
অধ্যাদেশ অনুযায়ী দেশে ৫০০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনে একটি ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ গঠিত হবে। এর মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ মালিকানা থাকবে সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের হাতে। ব্যাংকটির প্রারম্ভিক পরিশোধিত মূলধন হবে ন্যূনতম ২০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার জন্য এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যাবে। তবে কোনো মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না।
এই বিশেষ আইনে ব্যাংকটিকে একটি ‘সামাজিক ব্যবসায়’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এখানে ব্যক্তিগত লভ্যাংশের পরিবর্তে অর্জিত মুনাফা পুনরায় সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে ব্যয় করতে হবে।
অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা মূল বিনিয়োগের অতিরিক্ত অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে পাবেন না। তবে সাধারণ ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে এই বিধান শিথিলযোগ্য রাখা হয়েছে, যাতে তারা বিনিয়োগের সুফল পেতে পারেন। অবশিষ্ট নীট মুনাফা সামাজিক খাতে ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা থাকবে।
ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড হবে ৯ সদস্যের। এর মধ্যে ৪ জন পরিচালক নির্বাচিত হবেন ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে। এ ছাড়া ৩ জন মনোনীত পরিচালক, ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং ভোটাধিকারবিহীন একজন পদাধিকারবলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকবেন। কোনো পরিচালক একটানা দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
ব্যাংকের কার্যাবলি: অধ্যাদেশে ব্যাংকের প্রধান কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—
- নতুন উদ্যোক্তাদের আত্মকর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে ঋণ প্রদান
- আমানত গ্রহণ
- ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য উদ্যোগ মূলধন সরবরাহ
- বিনা ফিতে কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান
- শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য, গবাদিপশু ও যন্ত্রপাতির জন্য ঋণ সহায়তা
খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে এই ব্যাংক ‘অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩’ অনুসরণ করতে পারবে। তবে ঋণ আদায়ে সামাজিক সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের জবরদস্তি বা অবমাননাকর পদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে না।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা বোর্ড বাতিল করা বা চেয়ারম্যান ও পরিচালক অপসারণের ক্ষমতাও রাখবে।
ব্যাংকের সব কার্যক্রম ‘ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১’ এবং ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬’–এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হবে। অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, সরকার শিগগিরই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করবে।

