অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি দেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক চালুর অনুমোদন দিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ থেকে জারি হওয়া ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬’ সামাজিক ব্যবসার মডেলে পরিচালিত ব্যাংকের পথ সুগম করছে। এতে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের নিয়ম, তদারকি এবং অর্থায়নের নতুন কাঠামো গড়ে উঠছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকা। এটি ১০০ টাকার মূল্যমানের ৫ কোটি শেয়ারে বিভক্ত থাকবে। প্রথম পর্যায়ে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে, যা ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের দ্বারা পূরণ হবে। এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের অংশ হবে অন্তত ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, তারা পরবর্তীতে শেয়ার ক্রয় করে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার হবেন।
সরকারের লক্ষ্য এই ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যেমন গ্রামীণ ব্যাংক ও অন্যান্য এনজিও শুধুমাত্র ঋণগ্রহীতা সদস্যদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারলেও, নতুন ব্যাংকটি যেকোন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত নিতে পারবে। এভাবেই ব্যাংকটি ঋণগ্রহীতা ও সাধারণ আমানতকারীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করবে।
অধ্যাদেশে সামাজিক ব্যবসার মডেলের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। এতে মূল লক্ষ্য সামাজিক সমস্যা সমাধান এবং বিনিয়োগকারীর মূল অর্থ ফেরত নিশ্চিত করা, কিন্তু কোন মুনাফা দেয়ার সুযোগ নেই। ক্ষুদ্র উদ্যোগ হিসেবে সেসব প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সর্বাধিক ২৫ জন কর্মী এবং ১.৫০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
নতুন ব্যাংকটি নিম্ন আয়ের মানুষ এবং প্রচলিত ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ, সঞ্চয় ও বীমা পরিষেবা প্রদান করবে। এর মাধ্যমে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে, মূলধন তৈরি করতে পারবে এবং উদ্যোগের শুরুতেই ক্ষমতায়নের সুযোগ পাবে। সরকারের আশা, এমন পদক্ষেপ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দারিদ্র্য দূর করতে সহায়ক হবে।
ঋণ আদায়ে নতুন ব্যাংকের নিয়মনীতি:
নতুন মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে ১৫ দিনের নোটিশ ছাড়া সরাসরি কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না। অর্থাৎ ঋণগ্রহীতা আগেই সচেতন থাকবেন।
খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারবে। এই পদক্ষেপের পরও যদি ঋণ আদায়ে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হয়, ব্যাংক প্রযোজ্য আইন, যেমন অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।
তবে অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ঋণ আদায়ে কোনো ধরনের জবরদস্তি করা যাবে না। এতে বলা হয়েছে, “খেলাপি ঋণ আদায়ে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক স্বচ্ছতা, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় রাখবে। ব্যাংক ঋণগ্রহীতাকে হয়রানি করা, অবমাননা করা বা মানব মর্যাদার পরিপন্থি কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে না।” নতুন নিয়মের মাধ্যমে ঋণ আদায় প্রক্রিয়ায় সামাজিক ন্যায্যতা বজায় থাকবে এবং ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত হবে।
লভ্যাংশ ব্যবহার ও প্রশাসনিক গঠন:
নতুন মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক সামাজিক ব্যবসার মডেলে পরিচালিত হবে। এতে বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র তাদের মূল অর্থ ফেরত পাবেন; কোন অতিরিক্ত মুনাফা পাবেন না। ব্যাংক যদি অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে, তা সংরক্ষিত তহবিলে রাখা হবে এবং সামাজিক খাতে বিনিয়োগ করা হবে।
ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে ১০ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে ৪ জন হবে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডার, ৩ জন অন্যান্য শেয়ারহোল্ডার এবং ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনয়ন অনুযায়ী থাকবেন। পরিষদ থেকে একজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কোনো ভোটাধিকার থাকবে না।

