১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লী ঋণের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, এমন কোনো নির্দেশনার বিষয়ে তিনি অবগত নন।
গত বৃহস্পতিবার অফিস সময় শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে রোববার দুপুর ১২টার মধ্যে নির্ধারিত তথ্য পাঠাতে বলা হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের ‘জরুরি নির্দেশনা’ অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সীমার কৃষি ও পল্লী ঋণের মোট আসল, সুদ বা মুনাফা এবং বকেয়া স্থিতির তথ্য ই-মেইলে পাঠাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ৫২ মিনিটে পাঠানো ওই ই-মেইলে পরবর্তী কর্মদিবস রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টা ৫৯ মিনিটের মধ্যে তথ্য জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘ডিরেক্টর স্যারের নির্দেশে আমি ১০ হাজার টাকার নিচের কৃষি ঋণের তথ্য চেয়েছি। সে অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে ই-মেইল পাঠানো হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, নির্দেশনা দেওয়া পরিচালকের নাম রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর চেয়ারপারসন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর কাছে কৃষি ঋণের তথ্য চাওয়া হয়েছে কি না, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।’
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতভাবেই বিভিন্ন তথ্য চেয়ে থাকে। তবে এবার প্রক্রিয়াটি ছিল ব্যতিক্রমী। স্বল্প নোটিশে শুধুমাত্র ই-মেইলের মাধ্যমে এই তথ্য চাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। এ বিষয়ে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকেও আলোচনা হয়নি। সাধারণত এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নির্বাহী পরিচালক, ডেপুটি গভর্নর এবং প্রয়োজনে গভর্নরের কাছে নোট উপস্থাপন করা হয়। তবে এই ক্ষেত্রে সেই ধাপগুলো অনুসরণ করা হয়নি।
রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, তাদের ব্যাংকে ১০ হাজার টাকার নিচে কৃষি ঋণ নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। এসব ঋণের বিপরীতে বর্তমানে পাওনা রয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। তিনি বলেন, ‘এমনিতেই আমরা ঋণ আদায়ে হিমশিম খাচ্ছি। এর মধ্যে যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ঋণ মওকুফের চাপ আসে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। এসব অর্থ তো আমানতকারীদের টাকা, ইচ্ছামতো মওকুফ করা যায় না।’
প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ও সহায়ক সুবিধা জোরদার না করে ঋণ মওকুফের সংস্কৃতি চালু হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রান্তিক কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের অপেশাদার আচরণ নতুন নয়। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষপাতিত্ব বারবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

