দেশ ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন গুনছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ, কিন্তু এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন আর এড়ানো যায় না—ব্যাংক খাতের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কতটা পূর্ণ হয়েছে?
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর সরকার ঘোষিত সংস্কার এজেন্ডার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের ব্যাংক খাতকে শক্ত ও স্বচ্ছ করা। খেলাপি ঋণে ভরা, রাজনৈতিক প্রভাব ও মালিকানার ঘনিষ্ঠতার কারণে জর্জরিত এই খাতকে পুনর্গঠন করা ছিল অর্থনীতির স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। তবে দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়েছে, তবু কাঠামোগত সংস্কারের মূল স্তম্ভগুলো এখনও বাস্তবায়নের আলো দেখেনি। এই পরিস্থিতি সরকারের অঙ্গীকার এবং কার্যকারিতার মধ্যে বিস্তর ফাঁকফোকর তুলে ধরছে।
প্রতিশ্রুতি ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বাস্তবায়ন তুচ্ছ:
সরকারের সংস্কার এজেন্ডার ঘোষণা করা হয়েছিল মূলত দুটি আইনকে কেন্দ্র করে। এগুলোকে বলা হয়েছিল ব্যাংক খাত সংস্কারের ‘মেরুদণ্ড’—
১. বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
২. ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামো সংস্কারের জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন।
কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দুটি আইনই এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায়। অর্থাৎ, যে জায়গা থেকে প্রকৃত সংস্কার শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেখানেই আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া। এ অবস্থায় প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে—দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে এই সময়োপযোগী সংস্কার কেন বাস্তবায়িত হয়নি, এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হলো?
পাস হলো সাময়িক ব্যবস্থাপনা, মূল সংস্কার দূরে: এ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে মাত্র দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছে—
- ব্যাংক রেজুলিউশন অধ্যাদেশ
- ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স অধ্যাদেশ
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, এগুলো মূলত সংকট মোকাবিলার সরঞ্জাম, প্রকৃত সংস্কার নয়। এই অধ্যাদেশগুলো ব্যাংক দেউলিয়া হলে কীভাবে সামাল দেওয়া হবে বা আমানতকারীদের আংশিক সুরক্ষা দেওয়া হবে—এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়। তবে বড় প্রশ্নগুলো এখনও অনির্দিষ্ট: কেন ব্যাংক দুর্বল হচ্ছে, দায় কার, এবং ক্ষমতার সীমা কোথায়—এসব মৌলিক বিষয় অনসোল্ভডই থেকে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন: কাগজে-কলমে আটকে:
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন—প্রয়োজনীয় আইন ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা মূলত কাগুজে। বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২ সংশোধনের খসড়া প্রায় চার মাস আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য ছিল—নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, এবং গভর্নরের সাংবিধানিক অবস্থান শক্ত করা।
প্রাথমিক খসড়ায় প্রস্তাব ছিল—বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড থেকে তিনজন সরকারি কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়া এবং গভর্নরকে মন্ত্রীর মর্যাদা প্রদান। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির মুখে খসড়া নরম করা হলেও এটি অনুমোদন পাননি, যা স্পষ্ট করে—সমস্যা কেবল ভাষার নয়, বরং ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে।
আইএমএফও এই সংস্কারের পক্ষে। ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তারা আইন খসড়া তৈরিতে সরাসরি কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। সর্বশেষ আর্টিকেল ফোর পর্যালোচনায় আইএমএফ সতর্ক করেছে—ব্যাংকিং ও রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব হলে প্রবৃদ্ধি ঝুঁকিতে পড়বে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি গভীর হবে। তবু তাদের বিবৃতির শেষ লাইনে উল্লেখ করা হয়েছে—গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তী সরকারের ওপর। অর্থাৎ বাস্তবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে দায়প্রাপ্তি সরাসরি বর্তমান সরকারের হাত থেকে ভবিষ্যতের ঘাড়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন: মালিকানা নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস: ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়ায় ৪৫টি সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে, মূল উদ্দেশ্য—ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা। প্রধান প্রস্তাবগুলো হলো—
- পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সংখ্যা ২০ থেকে কমিয়ে ১৫ করা।
- বোর্ডের অন্তত অর্ধেক সদস্যকে স্বাধীন পরিচালক করা।
- স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটির যাচাইকৃত তালিকা ব্যবহার করা।
- কোনও ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠান একাধিক ব্যাংকে ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার রাখবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসব পরিবর্তন ছাড়া ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, অভ্যন্তরীণ লুটপাট এবং প্রভাবশালী মালিকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা সম্ভব নয়।
মালিকদের আপত্তি, সরকারের স্তব্ধতা:
ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়ার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে মালিকদের আপত্তি। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) বলেছে, মালিকানার সীমা নির্ধারণ ‘বিনিয়োগ নিরুৎসাহক’, যা খাতের প্রবৃদ্ধি ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদরা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দেখাচ্ছেন—এটি বিনিয়োগ নয়, ক্ষমতার প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এটা কোনও কারিগরি বিলম্ব নয়। সমস্যা নিয়ন্ত্রণের। বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রভাব কমানো এবং ব্যাংক মালিকদের ক্ষমতা সীমিত করাই মূল আপত্তির জায়গা।” তাঁর মতে, আইন পাস না করে বিষয়টি পরবর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া মানে দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল।
পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ: সংস্কার না সময় কেনা?
সরকার ব্যাংক খাতের সংস্কারের বড় পদক্ষেপ হিসেবে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করেছে। উদ্দেশ্য ছিল—আমানতকারীর আস্থা ফেরানো, রাষ্ট্রের ঝুঁকি কমানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়া।
যা হয়েছে:
- ব্যাংকের সংখ্যা কমেছে
- প্রশাসনিক ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে
- তাৎক্ষণিক আতঙ্ক ঠেকানো গেছে। কোনও ব্যাংক ডুববে না”—এই বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছেছে
যা হয়নি: একীভূতকরণ মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেনি—
- খেলাপি ঋণের পাহাড়
- রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ বিতরণ
- দুর্বল ও স্বার্থসংঘাতপূর্ণ বোর্ড
- মালিকানার ঘনীভবন
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমিত তদারকি ক্ষমতা
রাষ্ট্র ও আমানতকারী ঝুঁকির মুখে: একীভূত ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর ফলে ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত পড়ছে করদাতা ও সাধারণ আমানতকারীর ওপর।
সংস্কার ছাড়া একীভূতকরণ টেকসই নয়: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একীভূতকরণ কার্যকর হতে হলে প্রয়োজন ছিল—
- ব্যাংক কোম্পানি আইনের কঠোর সংশোধন
- বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন
- দায়ী পরিচালক ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা
- পেশাদার বোর্ড ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা
এই কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া একীভূতকরণ হয়েছে, কিন্তু ব্যাংক খাত সুস্থ হয়নি।

