রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে সক্ষম হলেও সময়মতো সেই ঋণ আদায়ে দুর্বলতা রয়ে গেছে—এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তাঁর মতে, ঋণ ব্যবস্থাপনার মূল চ্যালেঞ্জ এখানেই।
আজ সোমবার রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) অনুষ্ঠিত সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, সঠিক গ্রাহক নির্বাচন করে ঋণ বিতরণ করা গেলে অনাদায়ী ঋণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর আরোপিত নানা বিধিনিষেধ এখনো কার্যকর থাকায় ঋণ ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। তাঁর ভাষায়, সরকারি ব্যাংক ঋণ দিতে পারলেও তা আদায়ে কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। এ কারণেই অতীতে ঋণ প্রবাহ সংকুচিত রাখতে হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০০ সালের আগের সময় থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল, যা টেকসই কোনো মডেল নয়।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংক যদি আমানত সংগ্রহ করে অথচ সেই অর্থ বৃহত্তর অর্থনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারে, তাহলে অর্জনের পরিধি সংকুচিত হয়ে পড়ে। সোনালী ব্যাংক এখন সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন, তবে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল সাহসিকতার সঙ্গে ঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, ভোক্তা ঋণ বা কনজিউমার লেন্ডিং খাত বিশ্বজুড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত খাত। একইভাবে হাউজ লেন্ডিংও বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু দেশের সরকারি ব্যাংকগুলো এখনো এসব খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি। বিশেষ করে কনজিউমার লেন্ডিংয়ে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোনালী ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন গভর্নর। তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকটি আংশিকভাবে বাণিজ্যিক নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে। এটিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কাঠামোয় নিয়ে যেতে হবে এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
গত বছরের মুনাফা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্জিত লাভ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে সহায়ক হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ক্যাপিটাল ও প্রভিশন ঘাটতি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে। এর ফলে আগামী দিনে সোনালী ব্যাংক ডিভিডেন্ড দিতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
গভর্নর আরও বলেন, সরকার সোনালী ব্যাংককে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক নীতিতে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দেবে এবং ভবিষ্যত সরকারগুলোও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর উপায় নিয়েও ব্যাংকটিকে সক্রিয়ভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনাদায়ী ঋণ পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি জানান, সোনালী ব্যাংকের এনপিএল বর্তমানে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এটি আগের তুলনায় কমেছে এবং আরও কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তবে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ঋণ বিতরণে অবশ্যই সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। মাঠপর্যায়ের প্রকৃত উদ্যোক্তা, বিশেষ করে সম্ভাবনাময় এসএমই উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি খাতে পারফরম্যান্স বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সোনালী ব্যাংককে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন গভর্নর।

