বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমে নতুন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে। এর আগে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির রেকর্ড ছিল গত বছরের অক্টোবরে, তখন হার ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা স্পষ্টভাবে কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে সুদের হার বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। পাশাপাশি নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল থাকায় নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সুদহার কমানোর দাবি উঠলেও এ মুহূর্তে সে পথে হাঁটছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই এখনও চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়নি। সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ছয় মাস অন্তর আগাম মুদ্রানীতির দিকনির্দেশনা দেয়। আগের বছরগুলোতে অর্ধবার্ষিকীর প্রথম মাসের মধ্যেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলেও এবার তা হয়নি।
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার জন্য প্রথমে ২৯ জানুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সম্ভাব্য তারিখ ধরা হয় ৩ ফেব্রুয়ারি। এখন বলা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহে মুদ্রানীতি ঘোষণা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নীতি সুদহার কমানো নিয়ে সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণেই বারবার তারিখ পরিবর্তন হচ্ছে। এরই মধ্যে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। আগের বছরের একই সময়ে এই স্থিতি ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। এক বছরে সুদসহ ঋণের স্থিতি বেড়েছে এক লাখ দুই হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৬ দশমিক ১০। আগের মাস নভেম্বর পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অথচ গত মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত গত দুই যুগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর আগে কখনও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এত নিচে নামেনি। এমনকি করোনাভাইরাস মহামারির সময় ২০২০ সালে বিনিয়োগ স্থবির থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল। পরবর্তী সময়ে তা আবার দুই অঙ্কে পৌঁছায়।তবে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসে। ওই মাসে হার ছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামগ্রিকভাবে এখন ঋণের চাহিদা দুর্বল। নির্বাচনের আগে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে যেতে চান না, যা স্বাভাবিক প্রবণতা। পাশাপাশি ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত অনেক ব্যবসায়ী এখন পলাতক বা কারাগারে রয়েছেন। তাদের মালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না। ফলে যেসব বড় গ্রাহক আগে বেশি ঋণ নিতেন, তাদের একটি বড় অংশ এখন বাজারের বাইরে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট। এসব কারণে প্রত্যাশিত হারে বিনিয়োগ হচ্ছে না। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

