ডলারের বাজারে হঠাৎ চাপ নয়, বরং উদ্বৃত্ত—এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্রিয় হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ায় ব্যাংকিং খাতে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই ঝুঁকি এড়াতে বাজারে হস্তক্ষেপ করে বড় অঙ্কের ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দেশের ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ) পদ্ধতিতে প্রায় ১৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০ কোটি ডলারের সমান। এ লেনদেনে প্রতি ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট ও কাট-অফ রেট নির্ধারণ করা হয় ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছর শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে মোট ৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। সে সময় এক ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে দ্রুত বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছে যায়। তৎকালীন সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা উদ্যোগ নিলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তখন বাধ্য হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত তিন অর্থবছরে বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১–২২ অর্থবছরে বিক্রি হয় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে, ওই সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা হয়েছিল মাত্র এক বিলিয়ন ডলারের মতো।
তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থপাচার রোধে কঠোর অবস্থান নেয় বর্তমান সরকার। এর প্রভাবে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়—দুটিই বেড়েছে। ডলারের সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় স্বাভাবিকভাবে দাম কমার কথা ছিল। কিন্তু বাজারে অস্থিরতা ঠেকাতে আগাম উদ্যোগ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে।
এরই মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩১৭ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয়ের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২ ফেব্রুয়ারি দিন শেষে দেশের গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম–৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, অর্থপাচার কমে যাওয়ায় অবৈধ হুন্ডি কার্যক্রমও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পাশাপাশি কয়েক মাস ধরে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকায় প্রবাসীরা আগের চেয়ে বেশি করে বৈধ পথে অর্থ পাঠাচ্ছেন।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে প্রবাসীরা দেশে মোট এক হাজার ৯৪৪ কোটি মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল এক হাজার ৫৯৬ কোটি ডলার। সে হিসাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ।

