বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা আপাতত থমকে গেল। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মৌলিক আইন পরিবর্তন বাস্তবসম্মত নয়—এমন অবস্থান জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে লিখিতভাবে অবহিত করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
এতে করে গভর্নরের মন্ত্রী পদমর্যাদা, জাতীয় সংসদের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়বদ্ধতা, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা—সবই অনিশ্চিত রয়ে গেল।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সংশোধনের প্রস্তাবটি বেশ আগেই অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। সর্বশেষ চিঠিতে অর্থ উপদেষ্টা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এ ধরনের মৌলিক আইন সংশোধনের দায়িত্ব পরবর্তী সরকারের হাতেই থাকাই যুক্তিযুক্ত হবে।
কেন স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ:
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন অপরিহার্য। বর্তমানে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে। পরিচালনা পর্ষদও গঠন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ফলে নীতিগতভাবে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রটি সীমিত হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতেই বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর কারিগরি সহায়তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দল সংশোধনী খসড়া তৈরি করে। পরে সেই খসড়ার ওপর কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের আইনি মতামত নেওয়া হয়।
খসড়ায় শুরুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে কোনো আমলাকে না রাখার প্রস্তাব ছিল। পরবর্তীতে সেটি সংশোধন করে পর্ষদে সরকারের একজন প্রতিনিধি, ছয়জন স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ, গভর্নর ও একজন ডেপুটি গভর্নরকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
গত বছরের ১৩ আগস্ট এ নিয়ে বিশেষ বোর্ড সভা হয়। পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে ২৭ আগস্ট আরেক দফা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে অক্টোবরের মাঝামাঝি সংশোধনী প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে চার মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সাড়া না পেয়ে গভর্নর সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টাকে চিঠি দেন। এর জবাবে অর্থ উপদেষ্টা জানান, এই সরকারের সময়ে অধ্যাদেশ জারি করা বাস্তবসম্মত নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থ উপদেষ্টার চিঠি এখনো তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। তবে এই সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন না হওয়াকে তিনি দুঃখজনক বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়, আর্থিক খাতের জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পরবর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সংশোধনী বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তাঁর চিঠিতে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সুশাসন কাঠামো শক্তিশালী করতে গভর্নরের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। তবে গভর্নরের পদমর্যাদা, নিয়োগ ও অপসারণ, বোর্ড কাঠামো, আর্থিক দায় সৃষ্টির ক্ষমতা এবং স্বার্থের সংঘাত প্রতিরোধ—এসব বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তিনি মনে করেন, যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার একটি মৌলিক আইন, তাই এতে সংশোধন আনতে হলে বিস্তারিত পর্যালোচনা এবং অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের সীমিত মেয়াদে এ ধরনের বড় পরিবর্তন বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ছাড়াও ব্যাংক খাত সংস্কারে আরও কয়েকটি আইন সংশোধনের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় থাকলেও সেগুলোর কোনোটিই অধ্যাদেশ আকারে জারি হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে—
- ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে পর্ষদে পরিবারতন্ত্র ঠেকানো
- খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন
- অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন
- মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন
তবে আমানত বীমা আইনে পরিবর্তন এনে ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বীমার আওতায় আনা হয়েছে! আমানতকারীর বীমা কভারেজও এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রক্রিয়াও শেষ ধাপে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের খসড়া অনেক আগেই প্রস্তুত ছিল। এখন তা আটকে যাওয়ার যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। তাঁর মতে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সম্ভবত সংশোধন চায় না।
কারণ প্রস্তাব অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ডে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব তিনজন থেকে কমিয়ে একজনে নামিয়ে আনার কথা ছিল। ড. জাহিদ হোসেন একে ‘পাওয়ার গেম’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষায়, আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বের প্রশ্নেই ফাইলটি লাল ফিতার গিট্টুতে আটকে গেছে। তাঁর দাবি, গত ডিসেম্বরের মধ্যেই অধ্যাদেশ জারি করা সম্ভব ছিল। পরবর্তী সরকারের ওপর দায় চাপানো আসলে বিষয়টি আটকে রাখার কৌশল।

