আজ নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এটি হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৃতীয় মুদ্রানীতি ঘোষণা।
আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মেয়াদের জন্য এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূল্যস্ফীতি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে অবস্থান করছে। এ কারণে আগের মতোই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। আগের মাস ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। নভেম্বর ও সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ২৯ এবং ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। টানা তিন মাস বাড়তে থাকায় জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে যে সুদহারে ঋণ দেয়, সেটিই নীতি সুদহার। আগের মুদ্রানীতিতে ২০২৬ অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব। সে কারণেই নতুন মুদ্রানীতিতেও কঠোর অবস্থান বজায় রাখা হবে। তাঁর ভাষায়, দেশে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে এবং এটি নিয়ন্ত্রণ করাই নীতিনির্ধারকদের মূল লক্ষ্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নীতি সুদহার কমানোর চাপ রয়েছে। তাদের দাবি, উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক বেশি। এই অবস্থায় নীতি সুদহার পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি আরও বলেন, আগামী মুদ্রানীতির আগেই যদি মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, তখন নীতি সুদহার কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা জানান, ডলারের দর স্থিতিশীল রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ডলারের বাজার অস্থির হলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ছয় মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে আসছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই নীতি আরও কঠোর করা হয়। যদিও ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমতে শুরু করেছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। তবে ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা আগের তুলনায় ব্যাংক ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না।

