বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও ঝুঁকি ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ত্রৈমাসিক আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মূলধন থেকে শুরু করে আয়যোগ্য সম্পদ সব সূচকেই অবনতি ঘটেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা কমেছে এবং ঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে।
গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার কমে গেছে, ব্যাংকের সম্পদের মানও ক্ষয় পেয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বৃদ্ধি ব্যাংকের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে মার্চ থেকে বেশিরভাগ ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ বেড়ে গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকের মোট সম্পদ মাত্র ১.২২ শতাংশ বেড়েছে। যদিও প্রভিশন সংরক্ষণের হার কিছুটা বেড়েছে, গত জুনের ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি ব্যাংক খাতের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়েছে।
লাভজনকতার দিক থেকে পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো লাভজনক অবস্থায় থাকলেও, চলতি বছরে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় মার্চ থেকে ব্যাংকগুলো লোকসানের মুখে পড়েছে। মার্চে মূলধন থেকে লোকসান ছিল মাত্র ০.১৮ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে ০.৫৪ শতাংশে উঠে গেছে। সম্পদ থেকে লোকসানও বেড়ে ৩.৯৯ শতাংশ থেকে ১৫.১০ শতাংশে পৌঁছেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঝুঁকি মোকাবিলা নিরীক্ষা বলছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। বিশেষ করে শীর্ষ দুটি ঋণগ্রহীতার নতুন খেলাপি হওয়ার প্রভাব ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি তৈরি করছে।
তারল্য পরীক্ষা অনুযায়ী, ১৮টি ব্যাংক পাঁচ দিনের অতিরিক্ত আমানত উত্তোলনের চাপ সহ্য করতে পারবে না। খেলাপি ঋণ কেবল বেড়েই চলেছে, তা কেন্দ্রীয়ভাবে কয়েকটি ব্যাংকে বেশি সংযুক্ত হয়ে আছে। মোট খেলাপি ঋণের ৬৯ শতাংশ মাত্র ১০ ব্যাংকে, আর ৫ ব্যাংকে মিলিতভাবে ৪৭ শতাংশ খেলাপি ঋণ আছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদারকি জোরদার করছে এবং নীতি সহায়তা দিচ্ছে। দুর্দশাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণ পুনর্গঠন সহায়তা, রপ্তানি আয় ধরে রাখা ও স্টার্টআপে অর্থায়নের ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বাড়াতে ও ব্যবসার গতি ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে।

