এক সময় বড় অঙ্কের যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল আমদানির অর্থায়নে বিদেশি ব্যাংকের ওপরই নির্ভর করতে হতো। দেশের ব্যাংকগুলোর তখন বৈদেশিক মুদ্রায় বড় ঋণসীমা, দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে বড় লেনদেনে বিদেশি ব্যাংকই ছিল ভরসা।
কিন্তু এক দশকে দৃশ্যপট বদলে গেছে। ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়িয়েছে দেশীয় ব্যাংকগুলো। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। দক্ষতা ও কাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে। এর ফলেই ট্রেড ফাইন্যান্স বা বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে নীরব এক পরিবর্তন এসেছে।
এখন দেশের আমদানি, রপ্তানি ও ব্যাংক গ্যারান্টির বড় অংশ পরিচালনা করছে স্থানীয় ব্যাংকগুলো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা এই খাতে নেতৃত্বের জায়গায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক শীর্ষ দেশীয় ব্যাংক হিসেবে অবস্থান শক্ত করেছে। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোও এখনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
ব্যাংকগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটের চাপের মধ্যেও স্থানীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। আগের তুলনায় বিদেশি ব্যাংকের বাজার অংশীদারত্ব কমেছে। বিপরীতে দেশীয় ব্যাংকের হিস্যা কয়েক গুণ বেড়েছে।
২০২৫ সালের হিসাবে বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়নে দেশি-বিদেশি সব ব্যাংকের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে এইচএসবিসি। ব্যাংকটি প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য পরিচালনা করেছে। এর পরেই আছে সিটি ব্যাংক, যারা ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন করেছে। প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক।
এরপর রয়েছে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, বাংলাদেশ। দেশীয় ব্যাংকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে আছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি, ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও সাউথইস্ট ব্যাংক।
তালিকায় এরপর রয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ডাচ্–বাংলা ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)।
প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসারই এই পরিবর্তনের বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। লেনদেন প্রক্রিয়া দ্রুত হয়েছে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় উন্নতি এসেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশীয় ব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১২০ বিলিয়ন বা ১২ হাজার কোটি ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন হয় মাত্র ২০টি ব্যাংকের মাধ্যমে। বৈদেশিক বাণিজ্য বলতে আমদানি, রপ্তানি ও ব্যাংক গ্যারান্টি—এই তিন ধরনের কার্যক্রমকে বোঝানো হয়।
বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতৃত্বে দেশি ব্যাংক
এক দশক আগেও বড় অঙ্কের যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল আমদানির অর্থায়নে বিদেশি ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা ছিল স্পষ্ট। দেশীয় ব্যাংকগুলোর তখন বড় আকারের বৈদেশিক মুদ্রা ঋণসীমা, দক্ষতা ও অবকাঠামো পর্যাপ্ত ছিল না। সময়ের সঙ্গে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠেছে তারা। ধাপে ধাপে সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে ট্রেড ফাইন্যান্স খাতে নীরব কিন্তু বড় পরিবর্তন এসেছে।
এখন আমদানি, রপ্তানি ও ব্যাংক গ্যারান্টি—এই তিন ক্ষেত্রে দেশীয় ব্যাংকগুলোই মূল ভরসা। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটের চাপ থাকলেও স্থানীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। আগের তুলনায় বিদেশি ব্যাংকের বাজার হিস্যা কমেছে। দেশীয় ব্যাংকের অংশ বেড়েছে কয়েক গুণ।
২০২৫ সালের হিসাবে দেশি-বিদেশি সব ব্যাংকের মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্যে শীর্ষে রয়েছে এইচএসবিসি। ব্যাংকটি ৯ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য পরিচালনা করেছে। ২০২৪ সালে তাদের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
দেশীয় ব্যাংকের মধ্যে এগিয়ে আছে সিটি ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির বৈদেশিক বাণিজ্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে ছিল ৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। শীর্ষ তিন ব্যাংকের মধ্যে দুটি এখন দেশীয়।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ৭ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য করেছে। তাদের পরেই রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, বাংলাদেশ। এছাড়া তালিকায় আছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি, ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও সাউথইস্ট ব্যাংক।
এরপর রয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ডাচ্–বাংলা ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)।
দেশে বছরে প্রায় ১২০ বিলিয়ন বা ১২ হাজার কোটি ডলারের বৈদেশিক বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন হয় ২০টি ব্যাংকের মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মতে, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ট্রেড ফাইন্যান্স এই পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি। দেশীয় ব্যাংকগুলো ব্যাক-অফিস কার্যক্রম আধুনিক করেছে। সেবা হয়েছে ডিজিটাল ও কাগজবিহীন। এতে লেনদেনের গতি বেড়েছে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্ত হয়েছে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, তারা সব শ্রেণির গ্রাহকের আমদানি-রপ্তানির ব্যাংক হতে চেয়েছেন। করপোরেট হাউসের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগণের প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি এবং দেশীয় মূল্য সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের রপ্তানিতে জোর দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের ব্যাক-অফিস গড়ে তোলায় পুরো বাণিজ্য সেবা এখন ডিজিটাল হয়েছে।
তিনি জানান, আইএফসির গ্লোবাল ট্রেড ফাইন্যান্স প্রোগ্রামে কনফার্মিং সুবিধা পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি ব্যাংক সিটি ব্যাংক। এতে বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে কার্যকর ঝুঁকি ভাগাভাগি সম্ভব হচ্ছে। ঋণপত্র অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চয়তা ছাড়াই গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। রপ্তানিকারকেরা এতে সুবিধা পাচ্ছেন।
অন্যদিকে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের বড় ব্যবসায়ীরা তাদের গ্রাহক। রপ্তানিকারক ও ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকেরা বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সেবা আধুনিকায়নের ফলে বাণিজ্য বাড়ছে। সব মিলিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যে এখন দেশীয় ব্যাংকগুলোই চালকের আসনে।
আরও যারা তালিকায়
২০২৪ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, বাংলাদেশ–এর বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা সামান্য কমে হয়েছে ৬ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক–এর বাণিজ্য বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, পরিচালকদের বড় অংশ পোশাক খাতের ব্যবসায়ী। ফলে এ খাতের প্রায় ৩০০ কোম্পানি তাদের ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করে। খেলাপির হার ৩ শতাংশের কম। রপ্তানির বিপরীতে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। ডলারের সংকট না থাকায় বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ছে। বিদায়ী বছরে পরিচালন মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক–এর বৈদেশিক বাণিজ্য কমেছে। ২০২৪ সালে ৭ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার থাকলেও ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে ব্র্যাক ব্যাংক এক দশকে বড় উত্থান দেখিয়েছে। ২০১৫ সালে তাদের বাণিজ্য ছিল ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, এক দশকে বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় রূপান্তর এসেছে। সনাতনী পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উত্তরণ করা হয়েছে। ক্রেতার চাহিদা বদলেছে। সরবরাহকারীদের সেই অনুযায়ী খাপ খাওয়াতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলেই বাণিজ্য অর্থায়ন বেড়েছে।
একই প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ইস্টার্ন ব্যাংক–এর ক্ষেত্রেও। ২০১৫ সালে তাদের বাণিজ্য ছিল ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার।
তবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ–এর বাণিজ্য কমেছে। ২০২৪ সালে ৮ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে সাউথইস্ট ব্যাংক–এর বাণিজ্য ৫ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।
খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিশ্ববাণিজ্যের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ এখন ‘ওপেন-অ্যাকাউন্ট’ পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। এ ব্যবস্থায় আগে পণ্য পাঠানো হয়, পরে মূল্য পরিশোধ করা হয়। এতে অর্থ না পাওয়া বা বিপক্ষ পক্ষের দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তবু ক্রেতার পছন্দ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশও এ পথে এগোচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ‘ট্রেড ক্রেডিট ইনস্যুরেন্স’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মোট বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহের প্রায় ১৫ শতাংশ এ সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। বাংলাদেশেও এ সেবা চালুর উদ্যোগ চলছে। এতে রপ্তানিকারকের জাহাজীকরণের পরবর্তী ঝুঁকি কমবে। ব্যাংকগুলো নন-রিকোর্স ফাইন্যান্সিংয়ের সুযোগ পাবে। সময়ের চাহিদা মেনে এমন আধুনিক ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন!

