দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশ আগ্রাসী ঋণ বিতরণ নীতির কারণে নিজেরাই ঝুঁকিতে পড়ে গেছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে। নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে ঋণ দেওয়ার ফলে একদিকে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, অন্যদিকে আমানত প্রবাহ প্রত্যাশামতো না বাড়ায় তারল্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ব্যাংকগুলো তাদের মোট আমানতের সর্বোচ্চ ৮৩ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারে। বাকি ১৩ শতাংশ গ্রাহকদের নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ আমানত হিসেবে রাখতে হয়।
শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা আলাদা। তাদের মোট আমানতের সাড়ে ৯ শতাংশ বিধিবদ্ধ আমানত হিসেবে রাখতে হয় এবং অবশিষ্ট সাড়ে ৯০ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ করা যায়।
কিন্তু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাস্তবে অনেক বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংক এই সীমা মানছে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো গড়ে তাদের মোট আমানতের ৯৪ দশমিক ১০ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে। অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
এতে স্পষ্ট যে, তারা আমানতের তুলনায় বেশি ঋণ দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো—এই ঋণের একটি বড় অংশ সময়মতো আদায় হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়ছে এবং তারল্য সংকট তীব্র হচ্ছে।
শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। তারা মোট আমানতের তুলনায় ১২১ দশমিক ৮০ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৩১ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।
এই অতিরিক্ত অর্থ তারা সংগ্রহ করেছে অন্য ব্যাংক ও বন্ড মার্কেট থেকে ধার নিয়ে। বাজার থেকে ধার করে ঋণ বিতরণের এমন নজির বেআইনি এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে এসব ব্যাংকে তারল্য সংকট বেশি এবং খেলাপি ঋণের চাপও দ্রুত বাড়ছে।
শুধু বিধিবদ্ধ আমানত নয়, প্রতিদিনের লেনদেন নিষ্পত্তির জন্যও ব্যাংকগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ অর্থ নিজেদের কাছে রাখতে হয়। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ব্যাংক সেই প্রয়োজনীয় রিজার্ভও রাখেনি।
এতে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন বা আন্তঃব্যাংক লেনদেনের সময় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা মোট আমানতের ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে। সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৮৭ শতাংশ, যা সীমার মধ্যে।
বিদেশি ব্যাংকগুলো আরও রক্ষণশীল নীতি অনুসরণ করছে। তারা মোট আমানতের মাত্র ৫৫ দশমিক ৩০ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে।চিত্র
সার্বিকভাবে দেশের ব্যাংকগুলো মোট আমানতের ৮৬ দশমিক ৯০ শতাংশ ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে বিতরণ করেছে—যা সামগ্রিক সীমার তুলনায় কম।
তবে সমস্যা হচ্ছে, কয়েকটি বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাসী ঋণনীতির কারণে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর ঝুঁকির ছায়া পড়ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শরিয়া ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগ একটি গ্রুপের দখলে চলে যায়। দখল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেসব ব্যাংকে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকেও অনিয়ম ও দখলকেন্দ্রিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আর্থিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ বিতরণে নিয়ন্ত্রণহীনতা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখা দিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিয়েছে—সীমা না মানলে ঝুঁকি শুধু একটি ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রভাব পড়ে পুরো আর্থিক ব্যবস্থায়।
এখন দেখার বিষয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কত দ্রুত ও কঠোরভাবে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়।

