দেশের দায়িত্ব নিয়েছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। কিন্তু অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত—ব্যাংকিং—এখনও অস্থির। বিপুল খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার ও দীর্ঘদিনের অনিয়ম নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং অর্থপাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামগ্রিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
গত সরকারের সময়ে দীর্ঘদিন অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও পরিকল্পনাহীন ঋণ বিতরণের কারণে খাতটি গভীর সংকটে পড়ে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান মনে করেন, ব্যাংক খাতের ক্ষত চিহ্নিত করতে নতুন করে টাস্কফোর্স গঠন প্রয়োজন। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ নিয়ে আলাদা কৌশল নেওয়া জরুরি। যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ বিতরণের ফলেই আজ বিপুল অঙ্কের অর্থ খেলাপি হয়েছে। শক্ত হাতে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণ ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা খেলাপি। অর্থাৎ মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি অবস্থায়। যা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রবণতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সেই চিত্র আর আড়াল করা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ফলে প্রকৃত অবস্থা সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শৃঙ্খলা এলে ভুয়া ঋণ বিতরণ বন্ধ হবে। হুন্ডি কমবে। রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বাড়বে। তার ভাষায়, খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের ক্যান্সারের মতো। এ সমস্যা সমাধানের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমানো ও রাজস্ব বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ছয়টি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশ জারি করে একাধিক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নেওয়া হয়েছে। তবু কাঙ্ক্ষিত স্থিতি ফেরেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য, শুধু নীতি সুদহার বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পণ্য সরবরাহ চ্যানেলেও শৃঙ্খলা দরকার। তবে হুন্ডি কমাতে সাফল্য এসেছে বলে দাবি করা হয়। এতে রেমিট্যান্স বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বৃদ্ধি পেয়েছে। শেখ হাসিনা দেশত্যাগের সময় রিজার্ভ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হওয়ার সময় তা ২৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি জানিয়েছে, গত ১৫ বছরে ‘চামচা পুঁজিবাদ’ থেকে ‘চোরতন্ত্র’ গড়ে উঠেছিল। এতে রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং বিচার বিভাগের সদস্যরাও জড়িত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ বছরে ২৮টি উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, গত দেড় বছরে হুন্ডি দমন ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। ফলে ডলারের দর খুব বেশি ওঠানামা করেনি। ব্যাংকগুলো প্রবাসী অধ্যুষিত দেশগুলোতে প্রচার বাড়িয়ে রেমিট্যান্স সংগ্রহে জোর দিয়েছে। এতে রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা মিলেছে। নতুন সরকারের উচিত হবে হুন্ডির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা।
ব্যাংক খাত এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে—খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার ও সুশাসনের ঘাটতি। এসব মোকাবিলায় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ।

