বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতি ধরে রাখতে আবারও ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল রোববার ৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১২ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মাল্টিপল প্রাইস অকশন পদ্ধতিতে হওয়া এ ক্রয়ে প্রতি ডলারের কাট-অব দর ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। এক্সচেঞ্জ রেটও একই ছিল।
এই লেনদেনের ফলে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ডলার কেনার পরিমাণ পাঁচ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত কেনা হয়েছে ৫৩৮ কোটি ডলার বা ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। শুধু ফেব্রুয়ারিতেই কেনা হয়েছে ১৪৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ডলার ক্রয়ের ধারাবাহিকতায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে। এতে ব্যাংকগুলোতে ডলারের সরবরাহ বাড়ে। সরবরাহ বেশি হলে স্বাভাবিকভাবে ডলারের দর কমার চাপ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে যোগান ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষায় বাজার থেকে ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বাজারে ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি। দর অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বাজার স্থিতিশীল রাখতে ডলার কেনা হচ্ছে। এতে রিজার্ভও শক্তিশালী হচ্ছে।
এ ধরনের বাজারভিত্তিক হস্তক্ষেপ বিনিময় হারে অস্থিরতা কমায়। একই সঙ্গে রিজার্ভ বাড়িয়ে বৈদেশিক খাতে আস্থার পরিবেশ জোরদার করে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩১৭ কোটি ডলার। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
তবে পরিস্থিতি সবসময় এমন ছিল না। ২০২২ সালে ডলার বাজারে বড় অস্থিরতা দেখা দেয়। প্রতি ডলারের দর ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিলেও বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। একপর্যায়ে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গত তিন অর্থবছরে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১–২২ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি হয়। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা হয়েছে মাত্র প্রায় এক বিলিয়ন ডলার।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থপাচার রোধে বর্তমান সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়। এতে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়তে শুরু করে। ফলে ডলারের সরবরাহও বৃদ্ধি পায়। চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় দর কমার চাপ তৈরি হলেও বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজ উদ্যোগে ডলার কিনছে।
উল্লেখ্য, দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল ২০২১ সালের আগস্টে। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় তা ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

