ব্যাংকখাতে তারল্য বৃদ্ধির প্রভাবে সরকারি স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্র ট্রেজারি বিলের সুদহার আবারও কমেছে। এক মাসের ব্যবধানে তিন মেয়াদের বিলেই সুদের হার নেমেছে ৪০ থেকে ৫৯ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত।
গতকাল রোববার ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নিলামে এই হার কমার চিত্র স্পষ্ট হয়। জানুয়ারির তুলনায় ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিল—সবগুলোর ফলন কমেছে।
কোন মেয়াদে কত কমলো:
সর্বশেষ নিলামে ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ০২ শতাংশ। ৫ জানুয়ারি এই হার ছিল ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ ৪০ বেসিস পয়েন্ট কমেছে।
১৮২ দিনের বিলের সুদহার হয়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। জানুয়ারিতে ছিল ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। কমেছে ৪৩ বেসিস পয়েন্ট। ৩৬৪ দিনের বিলের সুদহার নেমে এসেছে ১০ দশমিক ০৭ শতাংশে। জানুয়ারিতে যা ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এখানে কমেছে ৫৯ বেসিস পয়েন্ট।
ট্রেজারি বিল হলো সরকারের স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্র। সাধারণত ৯১ থেকে ৩৬৪ দিনের জন্য সরকার এগুলো ইস্যু করে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিলামে অংশ নিয়ে এসব বিল কেনে।
কেন কমছে সুদহার:
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট–এর মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম মনে করেন, মূলত দুটি কারণে সুদহার কমেছে।
প্রথমত, নিলামের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কিনছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে তারল্য বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নিলামের মাধ্যমে ৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে কেনা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ডিসেম্বর মাসে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে। ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত অর্থ জমা থাকছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ডিএমডি বলেন, ব্যাংকিং খাতে এখন “ব্যাপক তারল্য” রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার ফলে বাজারে টাকার জোগান বেড়েছে। পাশাপাশি আমানতের পরিমাণও আগের চেয়ে বেশি। আমানত বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের তারল্য শক্তিশালী হয়। আরেক বেসরকারি ব্যাংকের ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, সরকারের ঋণগ্রহণও এ সময়ে তুলনামূলক কম। কারণ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নে গতি নেই।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এডিপি ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ দশমিক ২৯ কোটি টাকা। গত নয় অর্থবছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। এমনকি আগের অর্থবছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনের সময়ের তুলনায়ও এবার ব্যয় কম।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নেমেছিল। একই সময়ে তিন মাসের ব্যবধানে ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২৪৬ বেসিস পয়েন্ট কমে যায়। দুই বছরের মধ্যে সেটিই ছিল প্রথমবার, যখন এই হার ১০ শতাংশের নিচে নামে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংকখাতে বাড়তি তারল্য, কম ঋণচাহিদা এবং সরকারের তুলনামূলক কম ধার—এই তিন কারণেই ট্রেজারি বিলের সুদহার নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে।

