দেশের অন্যতম মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এ বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং নগদ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ব্যারিস্টার আরমান বলেন, তিনি নগদকে নতুন মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় দিতে চাইছেন এবং এ প্রক্রিয়ায় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি নিজে দেশী-বিদেশী বহুজাতিক বিনিয়োগ সংস্থার স্থানীয় সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন। বিনিয়োগ আগ্রহের অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নগদের ফরেনসিক অডিট করার আবেদনও করেছেন। এ বিষয়ে তিনি গত ৮ ফেব্রুয়ারি গভর্নর বরাবর চিঠি প্রেরণ করেছেন।
ব্যারিস্টার আরমানের রাজনৈতিক পরিচয়ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতে ইসলামী’র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালে তিনি গুম হন এবং আট বছর ‘আয়নাঘর’-এ বন্দি থাকেন। ২৪শে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পান। তিনি বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা মীর কাসেম আলী’র ছেলে।
নগদে বিনিয়োগের আগ্রহ বিভিন্ন মহলে কৌতূহল তৈরি করেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এ চিঠি পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। ব্যারিস্টার আরমানের দাবি, তার পরিচিত বিদেশী বিনিয়োগকারীরাই এখানে মূলত বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া এমন বিনিয়োগ উভয় পক্ষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
চিঠিতে তিনি গভর্নরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। লিখেছেন, “প্রথমেই ‘নগদ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস’ বিষয়ে আমাকে দেয়া আপনার মূল্যবান সময় ও গঠনমূলক পরামর্শের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বৈঠকটি আমার অনুরোধে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স প্রাপ্তির লক্ষ্যে আপনার সহায়তা পাওয়া। দেশের মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, ক্রমবর্ধমান ও ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রদানই আমার স্বপ্ন ও লক্ষ্য।”
চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, নগদ পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে এটি নতুন মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মূল্যায়নের পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হতে প্রস্তুত, যার মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এতে ডিজিটাল আর্থিক সেবার আর্থিক, পরিচালনাগত ও ব্যবসায়িক অবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে। ব্যারিস্টার আরমান গভর্নরের কাছে সর্বোচ্চ সহায়তা কামনা করেছেন যাতে ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে নগদ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, তিনি ‘নগদ’-এর হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য জানেন না। আরিফ হোসেন খান বলেন, “পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক হিসেবে ‘নগদ’-এর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হলে সেটি আমার জানা থাকা উচিত। তবে এখন পর্যন্ত গভর্নর স্যার কিংবা অন্য কেউ আমাকে কিছু জানাননি। বিষয়টি হয়তো একেবারেই প্রাথমিক আলাপ-আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।”
নগদের মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হবে। সর্বোচ্চ দরদাতা মালিকানা পাবে। টেন্ডার ছাড়া কোনো ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে মালিকানা হস্তান্তরের আলাপ-আলোচনা হওয়া সম্ভব নয়।”
নগদে বিনিয়োগের অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “ব্যারিস্টার আরমান দীর্ঘ সময় গুম ও আয়নাঘরে ছিলেন। তাই এমন বড় বিনিয়োগ, অর্থের উৎস এবং আইনি-নীতিগত দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি ঢাকা-১৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই যেন প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়, সেটাও বিবেচনা করা উচিত।”
নগদ ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ যাত্রা শুরু করে। শুরুতে এটি বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সেবা হলেও মালিকানা ছিল থার্ড ওয়েভ টেকনোলজি কোম্পানির হাতে। প্রতিষ্ঠার সময় নেতৃত্বে ছিলেন তানভীর আহমেদ মিশুক, সঙ্গে ছিলেন কাজী মনিরুল কবির, সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, সৈয়দ আরশাদ রেজা ও মিজানুর রহমান। কার্যক্রম শুরুর আগে কিছু অংশীদার শেয়ার ছেড়ে দেন। এরপর শেয়ার ক্রয় করেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক ও রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের স্ত্রী রেজওয়ানা নূরওও মালিকানায় যোগ দেন, পরে তিনি শেয়ার ছেড়ে দেন।
বর্তমানে নগদ লিমিটেডের পরিচালক নয়জন, যারা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে নিবন্ধিত কোম্পানির প্রতিনিধি। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সিঙ্গাপুরের একজন করে বিদেশি, বাকিরা বাংলাদেশী। ওই কোম্পানির মালিক ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ও ব্যবসায়ী। বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স ছাড়াই এমএফএস-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল ‘নগদ’।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকারের পতনের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং প্রশাসক নিয়োগ করে। প্রথমে প্রশাসক ছিলেন ব্যাংকের পরিচালক মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার, পরবর্তীতে পদটি নেন মো. মোতাছিম বিল্লাহ।
পর্ষদ ভাঙার পর বিশেষ নিরীক্ষায় নগদে ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট ব্যবহার করে আর্থিক জালিয়াতি এবং অতিরিক্ত ই-মানি তৈরি করার তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিরীক্ষায় দেখা যায়, ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা হিসাব মেলেনি। ভুয়া ই-মানি ও জালিয়াতির মাধ্যমে এই টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই মামলায় নগদ উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও নগদ সূত্র জানায়, গত এক বছরে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন পক্ষ ‘নগদ’-এর মালিকানায় যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর পক্ষ থেকেও বিভিন্ন পক্ষকে মালিকানায় আনার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে কোনো প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নগদের বর্তমান বাজারমূল্যও নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়নি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্ববিখ্যাত অডিট প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির মাধ্যমে নগদ-এর সম্পদের মানের ফরেনসিক নিরীক্ষা করিয়েছে। বর্তমানে নগদ-এর মাধ্যমে দৈনিক লেনদেন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। গত জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৪০ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা (নাম অপ্রকাশিত) বলেছেন, “নগদ-এর মালিকানা হস্তান্তরের যে আলোচনা হচ্ছে, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ শেয়ার এখনো নগদ লিমিটেড-এর নামে, যার মালিক পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ী। মালিকানা হস্তান্তর করতে হলে আগে শেয়ার সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হবে। তখনই তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের প্রশ্ন আসতে পারে।”
আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, নগদের মতো প্রতিষ্ঠানে মালিকানা নেওয়া বা বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। উল্লেখ্য, নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী ব্যারিস্টার আরমানের সম্পদ ২ কোটি টাকা, তাই তার বিনিয়োগ আগ্রহ সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিনিয়োগ ও ফরেনসিক অডিট নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান বলেছেন, “দেশি-বিদেশি বহুজাতিক বিনিয়োগ সংস্থার স্থানীয় সমন্বয়ক হিসেবে আমরা কাজ করছি। দেশের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিদেশী বিনিয়োগ অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার লুটপাট করে নগদকে শেষ করে দিয়েছে। ভালো বিনিয়োগকারী পেলে তাদের হাতে নগদের ব্যবস্থাপনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে, যাতে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আমরা চাই দেশের অর্থনীতি গতিশীল হোক এবং যেখানে সম্ভব সেখানে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে।”

