বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হতে কী যোগ্যতা লাগবে—এ নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা নেই। উন্নত অনেক দেশে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কাঠামো থাকলেও এখানে সরকার চাইলে যে কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল বুধবার দেশের চতুর্দশ গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান। তিনি হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
১৯৬৬ সালে জন্ম নেওয়া মোস্তাকুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিকম (অনার্স) ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৯২ সালে আইসিএমএবি থেকে পেশাদার ডিগ্রি নেন। তিনি বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংকবিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সময়কালে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদ সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া ঢাকা চেম্বার, রিহ্যাব ও আটাবের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী বলা আছে, সরকার গভর্নর নিয়োগ দেবে। মেয়াদ চার বছর। চাইলে তা বাড়ানো যাবে।
সাধারণভাবে গভর্নরের কাছে আর্থিক বাজার ও অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান প্রত্যাশিত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও অর্থায়নব্যবস্থা নিয়েও অভিজ্ঞতা দরকার। দেশের মুদ্রা সরবরাহ, টাকার মান, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা—এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গভর্নরই নেন। তাঁর সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলে মানুষের জীবনযাপন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। তাই বেশির ভাগ দেশে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার নজির কম।
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় গভর্নরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৬৫ বছর। একাদশ গভর্নর ফজলে কবিরকে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দিতে ২০২০ সালে আইন সংশোধন করে বয়সসীমা ৬৭ করা হয়। তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ৬৭ বছর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন।
তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন সপ্তাহ আগে দ্বাদশ গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান তৎকালীন অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার। ২০২২ সালের ১১ জুন চার বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও তিনি যোগ দেন ১২ জুলাই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর তিনি আর ব্যাংকে যাননি। ৯ আগস্ট পদত্যাগ করেন।
এরপর ১৪ আগস্ট ত্রয়োদশ গভর্নর হন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তাঁকে নিয়োগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন করে বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়। যোগদানের সময় তাঁর বয়স ছিল ৭২ বছর ৮ মাস।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৪ জন গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন আমলা। প্রথম গভর্নর আ ন ম হামিদুল্লাহ (১৯৭২-৭৪) ছিলেন ব্যাংকার। তিনি পাকিস্তানের ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন, যা পরে উত্তরা ব্যাংক হয়।
দ্বিতীয় গভর্নর এ কে নাজিরউদ্দীন আহমেদ (১৯৭৪-৭৬) স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তানের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফেও কাজ করেছেন। সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্বে ছিলেন তৃতীয় গভর্নর এম নূরুল ইসলাম। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত টানা ১১ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন প্রথম আমলা গভর্নর এবং সিএসপি কর্মকর্তা।
চতুর্থ গভর্নর শেগুফ্তা বখ্ত চৌধুরী (১৯৮৭-৯২) ছিলেন কর ক্যাডারের কর্মকর্তা। পঞ্চম গভর্নর এম খোরশেদ আলম (১৯৯২-৯৬) ও ষষ্ঠ গভর্নর লুৎফর রহমান সরকার (১৯৯৬-৯৮) যথাক্রমে আমলা ও ব্যাংকার ছিলেন।
সপ্তম গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (১৯৯৮-০১) ছিলেন অর্থনীতির শিক্ষক ও আমলা। অষ্টম গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ (২০০১-০৫) ও নবম গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ (২০০৫-০৯) শিক্ষকতা ও আমলাতন্ত্র দুই ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞ ছিলেন। দশম গভর্নর আতিউর রহমান (২০০৯-১৬) ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক। একাদশ গভর্নর ফজলে কবির (২০১৬-২২) ও দ্বাদশ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার (২০২২-২৪) দুজনই সাবেক আমলা।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যতিক্রম উদাহরণও আছে। কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মার্ক কার্নি ২০০৭-০৮ সালের বিশ্বমন্দা থেকে কানাডাকে রক্ষা করে পরিচিতি পান। পরে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর নিয়োগ দেয়। ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি সে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সাধারণত ৮ থেকে ৯ সদস্য থাকেন। গভর্নর পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান। একজন ডেপুটি গভর্নর সদস্য থাকেন। এ ছাড়া অর্থসচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান সদস্য হন। বাকি সদস্যদের নেওয়া হয় বাইরে থেকে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাংক সংস্কার কমিটি গঠন করে। ১৯৯৯ সালের প্রতিবেদনে জাতীয় ব্যাংকিং উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সুপারিশ ছিল। গভর্নরের সর্বোচ্চ মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ ও তা আর না বাড়ানোর কথাও বলা হয়। পদমর্যাদা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের সমান করার প্রস্তাবও ছিল। তবে কোনো সরকারই তা বাস্তবায়ন করেনি।
গত বছরের অক্টোবরে গভর্নর থাকাকালে আহসান এইচ মনসুর প্রস্তাব দেন, গভর্নরের পদমর্যাদা পূর্ণ মন্ত্রীর সমান করা উচিত। পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধি কমানোর কথাও বলেন। সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক ও পরিবর্তনের ইতিহাস দীর্ঘ। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ সেই ধারাবাহিকতার নতুন অধ্যায় খুলল।

