বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে বিশৃঙ্খলা, বিক্ষোভ ও ‘মব’ তৈরি করে দাবি আদায়ের ঘটনা নতুন নয়। একাধিক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু একটি ঘটনা ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই এর প্রধান কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। ফলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ফিরে আসছে, তীব্রতাও বাড়ছে।
সর্বশেষ গত বুধবার গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে মব তৈরি করে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম উপদেষ্টাকে গাড়িতে তোলার সময় নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর আগে গভর্নর পরিবর্তনের খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা বাড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্যাংক ত্যাগ করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধেও কর্মকর্তা–কর্মচারীদের একাংশ বিক্ষোভ করেন।
কেপিআই হলেও থামেনি বিশৃঙ্খলা:
জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন’ বা কেপিআই হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে সভা–সমাবেশের অনুমতি সাধারণত দেওয়া হয় না। নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণ মানুষের পাঁচ ধরনের সেবা বন্ধ করে। এর মধ্যে ছিল সঞ্চয়পত্র ও প্রাইজবন্ড বিক্রি, ছেঁড়া–ফাটা নোট বিনিময়। সে সময় এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কেপিআই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই বছরের পর বছর ধরে একশ্রেণির কর্মকর্তা–কর্মচারী আন্দোলন, বিক্ষোভ ও মব তৈরি করে আসছেন। এতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও নিরাপত্তা—দুই দিকেই প্রশ্ন উঠছে।
অতীতেও গভর্নররা ছিলেন চাপে:
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে গভর্নরদের হেনস্তার অভিযোগ নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে গভর্নর খোরশেদ আলমকে আটকে রাখার ঘটনা ঘটে। ২০০৯ সালে গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ অবরুদ্ধ ছিলেন। এক ঘটনায় সালমান এফ রহমান গভর্নরের কলার চেপে ধরেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় শাস্তিমূলক পদক্ষেপের নজির সীমিত।
সমিতি, ক্লাব ও রাজনৈতিক বিভাজন:
বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি ও ইস্যু ঘিরে একাধিক সমিতি ও ক্লাব সক্রিয়। তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে নয়টি ক্লাব ও সমিতি রয়েছে। সহকারী পরিচালক ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল আছে। ক্যাশ অফিসারদের জন্য রয়েছে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। সব স্তরের কর্মকর্তা–কর্মচারীর জন্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্লাব। এক বা দুই বছর পরপর এসব সংগঠনের নির্বাচন হয়।
এর বাইরে হলুদ, সবুজ ও নীল—এই তিনটি প্যানেলও সক্রিয়। এগুলো মূলত রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিতে পরিচালিত। নীল প্যানেলে আওয়ামী লীগ–সমর্থিত কর্মকর্তারা, সবুজ প্যানেলে বিএনপি–সমর্থিত কর্মকর্তারা সক্রিয়। হলুদ প্যানেলে জামায়াত ছাড়াও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ–সমর্থিত কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নেন। কর্মচারীদের জন্য রয়েছে জাতীয়তাবাদী ফোরাম। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও জিয়া পরিষদও সক্রিয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বহুমাত্রিক সংগঠন কাঠামো ও রাজনৈতিক বিভাজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে জটিল করে তুলছে। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব পরিবর্তন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে বারবার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো কেপিআই প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা কতটা গ্রহণযোগ্য—এ প্রশ্ন এখন আবারও সামনে এসেছে।

