বাংলাদেশ ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ব্যাংক খাতে অস্বস্তি ও উদ্বেগ বেড়েছে। কিছু কর্মকর্তার বিক্ষোভ, গভর্নরের বিদায় এবং মব তৈরি করে কয়েকজনকে বের করে দেওয়ার ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য ব্যাংকেও।
গত বুধবার গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের বিদায়ের পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘চেইন অব কমান্ড’ বা আদেশ-অনুশাসনের কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই একাংশ কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে তারা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করছেন। কাকে কোথায় বসাতে হবে, সেই তালিকাও উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া হচ্ছে। দাবি না মানলে সংশ্লিষ্টদের ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে চাপে ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
এদের অনেকেই আগে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিজেদের বৈষম্যের শিকার দাবি করতেন। এখন আবার জাতীয়তাবাদী চেতনার সৈনিক পরিচয়ে আন্দোলনের সামনে রয়েছেন এবং বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সঙ্গেও ছবি পোস্ট করছেন। এতে পেশাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে বিব্রতবোধ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শৃঙ্খলা ভঙ্গ হলে ব্যবস্থা নেওয়াই নিয়ম। ক্ষমতাসীন বিএনপি মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়েছে। এখন দেখতে হবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁর মতে, অপেশাদার আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর না হলে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষ ব্যক্তিদের রাজি করানো কঠিন হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, একটি গোষ্ঠী পেশাদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মবের ঘটনা সেই প্রবণতাকে উসকে দিয়েছে। বিগত সরকারের সময় অনিয়ম বা জালিয়াতির কারণে পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তারা এখন বৈষম্যের অভিযোগ তুলে পদোন্নতি চাইছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কয়েকজনকে ‘সুপারনিউমারারি’ পদে উন্নীত করা হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় তা স্থগিত করে।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদ শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে। পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে এ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে বুধবার বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে বিক্ষোভ হয়। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মো. মহসিন ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান শেখ আশ্বাফুজ্জামানের পদত্যাগ দাবিতে কিছু কর্মকর্তা ব্যানার নিয়ে অবস্থান নেন। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো অভ্যন্তরীণভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে দুই ডেপুটি গভর্নর, বিএফআইইউ প্রধান ও নীতি উপদেষ্টা পদত্যাগে বাধ্য হন। তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার পলাতক অবস্থায় পদত্যাগ করেন। এর আগে ২০১৬ সালে রিজার্ভ চুরির তথ্য গোপনের অভিযোগে গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগে বাধ্য হন। সে সময় দুই ডেপুটি গভর্নরের নিয়োগও বাতিল করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক নির্বাহী পরিচালক বলেন, হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তা বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন। বুধবার গভর্নরের উপদেষ্টা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে মব করে বের করে দেওয়ার ঘটনায় সরকারি আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠেছে। এতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, আগে কখনও এই মাত্রার রাজনৈতিক প্রভাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেখা যায়নি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেয়। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ায় গত রোববার তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। মঙ্গলবার তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। এই বদলিকে কেন্দ্র করে বুধবার সকালে প্রতিবাদ সভা হয়। পরে গভর্নর নিজে অফিস ত্যাগ করেন। এরপর তাঁর উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ফারুক হাওলাদারকে মব তৈরি করে বের করে দেওয়া হয়।
একই দিন সন্ধ্যায় বিএনপিপন্থি দুই কর্মকর্তাকে মানবসম্পদ বিভাগ ও ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জোরপূর্বক বদলি করানোর অভিযোগ ওঠে। ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালককে চাপে ফেলে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে আদেশ করানোর ঘটনা প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান যোগদানের দিন অল্প সময় অফিস করলেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। রোববার তাঁর কাছে পুরো ঘটনার বিস্তারিত উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নীল দল থেকে নির্বাচিত অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল এক বিজ্ঞপ্তিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য, সর্বদলীয় কমিটির সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও ব্যাংকিং সার্ভিস সংক্রান্ত বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ হয়েছে। গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহর মেয়াদ শেষ হলেও তিনি অফিস করছিলেন বলে তাদের অভিযোগ। গভর্নর অফিস ত্যাগের পর তাঁকে নিরাপদে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা এগিয়ে দেন। ওই সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলেও কাউন্সিলের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করা হয়।
নতুন গভর্নর যোগদানের দিন বাংলাদেশ ব্যাংকে যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের উপস্থিতিও আলোচনার জন্ম দেয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তবে আত্মীয়ের পরিচয় না জানিয়েই তিনি চলে যান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের এই টানাপোড়েন এখন ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও পেশাদারিত্বের সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

