ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়, তখন দেশের ব্যাংক খাত গভীর সংকটের মধ্যে ছিল। ডলারের তীব্র সংকট ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম থমকে দিয়েছিল, যার প্রভাব পড়েছিল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতিতে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশ ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি ব্যাংককে অতিরিক্ত ঋণ দিয়ে চলছিল। টাকার ও ডলারের ঘাটতি এবং ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলার ভঙ্গ এই সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছিল।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ব্যাংক খাতের সংকট সামাল দিতে সহায়তা করে। দেড় বছরের দায়িত্বকালেই ডলার ও টাকার ঘাটতি অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।
সঙ্কটে থাকা পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। টাকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং নীতি সুদহার বাড়ানো হয়। তবে সুদ বাড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ১০ দিনের মধ্যে আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমানকে।
নতুন গভর্নরের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাতের সুশাসন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, তদারকি শক্তিশালীকরণ এবং ব্যাংকিং বিভাগ বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নতুন গভর্নরের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো:
- আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
- ব্যাংক একীভূত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা।
- ব্যাংকিং নিয়মকানুন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্যকর করা।
- নতুন করে কোন অনিয়ম বা গোষ্ঠী তৈরি না হওয়া নিশ্চিত করা।
সরকার ইতোমধ্যেই ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলো ত্বরান্বিত করতে হবে যাতে আইনি ভিত্তি শক্ত হয়। পাশাপাশি পাচার করা অর্থ উদ্ধারে তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, “ব্যাংক খাতে এখনো বড় সমস্যা রয়ে গেছে। ব্যাংক সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে, একীভূত উদ্যোগ শেষ করতে হবে, পেশাদার স্বতন্ত্র পরিচালক বসাতে হবে এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।”
ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা:
২০২৪ সালের আগস্টে আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেয়ার সময় ডলারের দাম লাফিয়ে উঠছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কম ছিল। তার বাজারভিত্তিক নীতি ও বৈদেশিক মুদ্রানীতি প্রয়োগে ডলারের সংকট কমে আসে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পায়, ফলে রিজার্ভও বাড়তে থাকে।
- ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রিজার্ভ ছিল ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ হিসাব (বিপিএম-৬) অনুযায়ী তখন ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলার।
- গত মঙ্গলবার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫.০৪ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ হিসাব অনুযায়ী ৩০.৩০ বিলিয়ন ডলার।
- ডলারের দাম ১২২-১২৩ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে।
তবে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। আহসান এইচ মনসুরের সময়ে অতীতের লুকানো ঋণ আন্তর্জাতিক নিয়মে নির্ণয় করা হয়। ক্ষমতার পালাবদলের পর কিছু ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে আসেননি। জুন ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১২.৫৬ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬.৫ লাখ কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে অনিয়মে জড়িত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করা হয়েছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক মিলে গঠন করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংক একীভূত প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। এছাড়া ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।
আহসান মনসুরের সময়ে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, নাবিল, সামিট, ওরিয়ন, জেমকন, নাসা, বসুন্ধরা, সিকদার ও আরামিট গ্রুপের অনিয়ম নিয়ে যৌথ তদন্ত শুরু হয়। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে লুট হওয়া অর্থ দেশে ও বিদেশ থেকে উদ্ধারে কাজ চলছে।
সুদহার ও মূল্যস্ফীতি:
আহসান এইচ মনসুর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহারকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ফলে সুদহার ১৪ শতাংশের ওপরে ওঠে এবং মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশে নেমে আসে। তবে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, সুদহার বাড়ায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত ও ব্যবসা–বাণিজ্য শ্লথ হয়ে গেছে।
সার্বিকভাবে, বিদায়ী গভর্নর কঠিন সময়ের মধ্যে দায়িত্ব পালন করেছেন। ডলার–টাকা সংকট সামাল দিয়েছেন এবং ব্যাংক খাতের পতন ঠেকিয়েছেন। এখন নতুন গভর্নরকে চলমান সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করে ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে হবে, যা রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সম্ভব নয়।

