দীর্ঘদিন ধরে লাগামছাড়া হারে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এসেছে। বিশেষ পুনঃতপশিল সুবিধা এবং আদায় কার্যক্রম জোরদারের ফলে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের প্রায় ৩১ শতাংশ।
এর আগে গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। তবে এক বছর আগের তুলনায় ডিসেম্বরের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখনো দুই লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণস্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখার প্রয়োজন ছিল চার লাখ ৪১ হাজার ৯১ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলো রাখতে পেরেছে মাত্র দুই লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।
তিন মাস আগে প্রয়োজন ছিল চার লাখ ৪৭ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং ঘাটতি ছিল তিন লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে প্রভিশন ঘাটতি কমেছে এক লাখ ৫২ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী অনেক ব্যবসায়ী দেশ ছেড়েছেন বা আইনি প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। অতীতে নীতি সহায়তার আড়ালে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার সুযোগ ছিল। নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি রেখেও লভ্যাংশ ঘোষণা করা যেত।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। একদিকে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে, অন্যদিকে ২০২৫ সালের জন্য সঞ্চিতি ঘাটতি রেখে কোনো ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারবে না—এমন নিয়ম করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো বিশেষ সুবিধায় পুনঃতপশিল ও ঋণ আদায় কার্যক্রমে জোর দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আগের সরকারের সময়ে একের পর এক শিথিলতার কারণে ঋণ আদায়ে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। সাম্প্রতিক কঠোরতার ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর ইতোমধ্যে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সব বিভাগের পরিচালকদের নিয়ে বৈঠকে তিনি জানান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসার খরচ কমানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বন্ধ কলকারখানা চালু করতে নীতি সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দেন।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের স্বার্থে নির্বাচিত সরকারও এই কঠোরতা বজায় রাখবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতপশিল ব্যবস্থা চালু হয়। এরপর থেকে নানা শিথিলতায় খেলাপি ঋণ কম দেখানো হচ্ছিল।
ঋণ পরিশোধ না করেও নিয়মিত দেখানো, নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতপশিল, এমনকি ভুয়া ঋণের মাধ্যমে দায় সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে, যখন নির্দেশনা দিয়ে মেয়াদি ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময়ের ৬ মাস পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে গণনা করা শুরু হয়। এতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ অনেকটাই আড়ালে থাকে।
তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপিতে পরিণত হওয়া ব্যাংক খাতের জন্য বড় ঝুঁকি।
বিশ্লেষকদের মতে, কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারলে খেলাপি ঋণ আরও কমানো সম্ভব। তবে শিথিল নীতি ফিরে এলে পরিস্থিতি আবারও অবনতির দিকে যেতে পারে।

