বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চাপের কারণে রফতানি খাতে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, সচল রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-ভাতা যথাসময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে চলতি মূলধন ঋণসীমার বাইরে বিশেষ মেয়াদি ঋণ সুবিধা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে জারি করা নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়িক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে। ধারাবাহিক নিম্নমুখী রফতানি, ক্রয়াদেশ পিছিয়ে যাওয়া এবং তারল্য সংকটের কারণে অনেক রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এর ফলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সক্ষমতা কমে গেছে। উৎপাদন সচল রাখা এবং রফতানির ধারা বজায় রাখতে জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন—এই বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ উদ্যোগ নিয়েছে।
সার্কুলার অনুযায়ী, গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে ব্যাংকগুলো চলতি মূলধন ঋণসীমার বাইরে মেয়াদি ঋণ দিতে পারবে। তবে ঋণের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিগত তিন মাসে প্রদত্ত গড় বেতন-ভাতার বেশি হতে পারবে না।
এই ঋণের ওপর বাজারভিত্তিক প্রচলিত সুদহার প্রযোজ্য হবে। নিয়মিত সুদ ছাড়া অন্য কোনো অতিরিক্ত সুদ, মুনাফা, ফি বা চার্জ আদায় করা যাবে না। ঋণটি তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে মাসিক বা ত্রৈমাসিক সমকিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, যে শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের মোট উৎপাদনের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ রফতানি করে, তাদের রফতানিমুখী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত শ্রমিকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করেছে—এমন প্রতিষ্ঠানকে ‘সচল’ হিসেবে ধরা হবে।
এই যোগ্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিত্বকারী বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হবে। তৈরি পোশাক খাতের ক্ষেত্রে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র মতো সংগঠনের প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক।
এ উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঋণের অর্থ সরাসরি শ্রমিক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবও এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান নয়, সরাসরি শ্রমিকের অ্যাকাউন্টে বেতন যাবে। এতে স্বচ্ছতা ও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সার্কুলারে স্বাক্ষর করেছেন পরিচালক (বিআরপিডি) মো. বায়েজীদ সরকার।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, অর্ডার স্থগিত হওয়া এবং ডলার সংকটের প্রভাব রফতানি খাতে স্পষ্ট। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে নগদ প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের বেতন বিলম্বিত হলে শিল্প অস্থিরতা ও সামাজিক চাপ বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তা হলেও উৎপাদন চেইন সচল রাখা এবং রফতানি আদেশ ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে প্রকৃত সচল প্রতিষ্ঠান শনাক্তকরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো ঋণ পুনরুদ্ধার—এসবই হবে বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ।

