একীভূত করা পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা গত দুই বছর ধরে নানা সংকটে ভুগছেন। টাকা তুলতে সীমাবদ্ধতা, লেনদেনে জটিলতা—সব মিলিয়ে তাদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে সর্বশেষ বিতর্ক তৈরি হয়েছে আমানতকারীদের হিসাব থেকে আগেই দেওয়া মুনাফার একটি অংশ কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে, যাকে বলা হচ্ছে ‘হেয়ার কাট’।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা তাদের স্থিতির ওপর ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। অথচ অনেকেই ১২-১৪ শতাংশ মুনাফার চুক্তিতে আমানত রেখেছিলেন। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ৭৫ লাখ গ্রাহক হেয়ার কাট বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে এখনো তা প্রত্যাহার হয়নি।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন কাঠামো গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা আমানত রয়েছে। বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংক পাঁচটি বড় অঙ্কের লোকসান করেছে। তাই পূর্ণ মুনাফা দেওয়া সম্ভব নয়। সেই বিবেচনায় ৪ শতাংশ মুনাফা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে আমানতকারীরা বলছেন, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ব্যাংকেই টাকা রেখেছিলেন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভুল বা অনিয়মের দায় কেন গ্রাহকদের নিতে হবে?
এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক শাহানুর রহমান বলেন, “আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। নতুন গভর্নর নিশ্চয়ই আমাদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনা করবেন।”
আরেক গ্রাহক মেহনাজ বেগমের অভিযোগ, “আমার নিজের টাকাই তুলতে পারছি না। চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার, কিন্তু ব্যাংক বলছে ঋণ নিতে পারি। নিজের টাকা রেখে কেন আমি ঋণ নেব?”
গ্রাহকদের দাবি, তারা একসঙ্গে সব টাকা তুলে নিতে চান না। শুধু স্বাভাবিক লেনদেন ও ন্যায্য মুনাফা চান।
বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব আলিফ রেজা বলেন, বিদায়ী গভর্নরের সিদ্ধান্ত অন্যায় ও আইনবহির্ভূত। অর্থনীতিবিদ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরাও এ সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। হেয়ার কাট প্রত্যাহারের দাবিতে তারা আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী এ সিদ্ধান্তকে অনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষায়, যদি ব্যাংক লোকসান করেও মুনাফা দিয়ে থাকে, তার দায় পরিচালকদের। বিনিয়োগকারীদের ওপর সেই দায় চাপানো ন্যায়সংগত নয়। এতে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে—যারা ইতোমধ্যে টাকা তুলে নিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে তো আর কাটা সম্ভব নয়। ফলে যারা এখনো আমানত রেখেছেন, তারাই শাস্তির মুখে পড়ছেন।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। মুনাফার ভিত্তিতে সরকার করও পেয়েছে। তাহলে সরকার কি সেই কর ফেরত দেবে?
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিনও বলেন, এতে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। সব আমানতকারীর জন্য সমান বিচার হচ্ছে না।
বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সিদ্ধান্তের পর নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তবে হেয়ার কাট নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানাননি।
অন্যদিকে গ্রাহকরা মনে করছেন, নতুন সরকার নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। তাই আগের “অন্যায় সিদ্ধান্ত” পুনর্বিবেচনা করা হবে—এমন আশা তাদের।
এখন প্রশ্ন—হেয়ার কাট পুরোপুরি প্রত্যাহার হবে কি না, কিংবা স্বাভাবিক লেনদেন কবে ফিরবে। ৭৫ লাখ গ্রাহকের আমানত ও আস্থার প্রশ্নে এটি শুধু একটি ব্যাংকিং সিদ্ধান্ত নয়; বরং আর্থিক খাতে বিশ্বাস পুনর্গঠনেরও বড় পরীক্ষা।
আগামী দিনের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—এই সংকট থেকে আমানতকারীরা কত দ্রুত স্বস্তি পান।

