বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল চারটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে নতুনভাবে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছে। একীভূতকৃত ব্যাংকগুলো হলো: ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী এবং এক্সিম ব্যাংক। এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
তবে ব্যাংক খাতে অনেকেই মনে করছেন, এই মার্জের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিগত ক্ষোভ। দুর্বল চার ব্যাংকের সঙ্গে তুলনামূলক শক্তিশালী এক্সিম ব্যাংককে যুক্ত করার পেছনে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার ছাপ ছিল। এক্সিম ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নজরুল ইসলাম মজুমদার যখন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান ছিলেন, তখনই তাঁর এবং ড. আহসান এইচ মনসুরের মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। সমস্যা শুরু হয়, যখন সাবেক গভর্নরের মেয়ে মেহেরীন সারাহ মনসুর এবং নজরুল মজুমদারের মেয়ে আনিকা ইসলাম রাজধানীর গুলশানে একটি বার ও স্পা সেন্টার খোলেন। কিছুদিনের মধ্যে সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে, এবং নজরুল মজুমদার আইনের মাধ্যমে বারটি বন্ধ করেন। এর ফলে সাবেক গভর্নর ও তার মেয়ে সম্মানহানির শিকার হন। এই ঘটনাকেই অনেকেই এক্সিম ব্যাংক মার্জের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন।
এক্সিম ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, “এক্সিম ব্যাংককে মার্জ করা হয়েছে ব্যক্তিগত রোষানলের কারণে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পুনর্গঠন চাওয়াও ফল দেয়নি।” সাবেক এক ডেপুটি গভর্নরও বলেন, “এক্সিমের মতো শক্তিশালী ব্যাংককে মার্জে যুক্ত করা বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত ছিল না। ব্যাংক মার্জের আগে মূলধন কাঠামো, সম্পদ, আমানতকারীদের আস্থা এবং পারফরম্যান্স বিশদে যাচাই করা উচিত ছিল।” তিনি আরও বলেন, দেশে আরও ১০–১৫টি ব্যাংক রয়েছে যা মূলধন ঘাটতি ও উচ্চ খেলাপি ঋণে ভুগছে। এই ব্যাংকগুলো মার্জ করা গেলে খাতের স্থিতিশীলতা বেশি হতো।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ড. আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করার উদ্যোগ নেন। ওই সময় এক্সিম ব্যাংক ছিল নজরুল মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে, আর চারটি ব্যাংক চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের। সূত্র মতে, এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় ছিল এক্সিম ব্যাংক। অন্য চারটি ব্যাংক মার্জে যুক্ত হলে লাভের পরিবর্তে ক্ষতি হতো। এক্সিম ব্যাংককে যুক্ত করার ফলে ব্যাংক খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি ব্যাংক বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, এক্সিম ব্যাংকের কোনো নগদ বা মূলধন ঘাটতি নেই, ঋণের বিপরীতে যথাযথ জামানত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংকের ৫২ হাজার ৭৬ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৪৮.২০ শতাংশ (২৫,১০১ কোটি) খেলাপি, প্রভিশন ঘাটতি ১৫,১১৭ কোটি টাকা।
অন্য ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৫,৩০৩ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ২২,৬৪৬ কোটি, আর গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫৪ শতাংশের বেশি। বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক প্রায় ২,২৫৯ কোটি টাকার লোকসান সত্ত্বেও ব্যালান্স শিটে ১২৮ কোটি টাকার মুনাফা দেখানো হয়েছে।
একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা মনে করছেন, ড. আহসান এইচ মনসুর ব্যক্তিগত রোষানলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কর্মকর্তাদের বেতন ২০ শতাংশ কমানো, এবং পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার মূল্য শূন্য ঘোষণা করার ফলে খাতের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীরা বড় ঝুঁকিতে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত, ২৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের মুখে ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব ছাড়েন। অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ মন্তব্য করেন, “পাঁচ ব্যাংককে মার্জ না করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাখা বাড়ানো যেত। এতে আমানত ঘাটতি কমে যেত।” ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

