দেশের ব্যাংক খাতে গত বছরের শেষ তিন মাসে মোট খেলাপি ঋণ ৮৭ হাজার কোটি টাকায় কমেছে। তবে একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। এটি দেশের মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ। তথ্যটি বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একীভূত পাঁচ ব্যাংক হলো— এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নজরুল ইসলাম মজুমদার। বাকি চারটি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সাইফুল আলম, যিনি এস আলম গ্রুপের কর্ণধার। উভয়েই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বিএফআইইউয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পাঁচ ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে মোট এক লাখ এক হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী এই দুই ব্যক্তি। তারা ব্যাংকের দায়িত্বে থাকাকালীন নামে-বেনামে ঋণ নিয়েছেন এবং এখন তা ফেরত দিচ্ছেন না। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষে ব্যাংকগুলো একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঋণ হয়েছে ৬০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঋণ বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বা ৮০ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা বা ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছর ধরে এই পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করার পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন, ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও দায় পর্যালোচনা, কারণ দর্শানোর নোটিস প্রদান এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ। ৯ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রস্তাব অনুমোদন করে।
উপদেষ্টা পরিষদে জানানো হয়েছে, ব্যাংক খাতে সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা আনার উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সেক্টর সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান— শ্রীলঙ্কাভিত্তিক কেপিএমজি এবং ইআই—তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করেছে।
উপদেষ্টা পরিষদকে জানানো হয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে পাঁচ ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তারপরও ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা উন্নতি হয়নি, বরং তারল্য সংকট গভীর হয়েছে। মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের টাকা পরিশোধে অক্ষম ছিল।
নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভায় অনুমোদন দেওয়া হয় ‘রেজুলেশন পরিকল্পনা ২০২৫’। ২৪ সেপ্টেম্বর ব্যাংক খাত সংকট ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের সভায় পাঁচ ব্যাংকের লোকসানের দায়ভার বহন করার সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যালোচনা করে দেখেছে, পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারমূল্য, বাজারমূল্য ও প্রকৃত সম্পদমূল্য ঋণাত্মক। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, মন্দ সম্পদ ও তারল্য সংকট গভীর। নতুন প্রতিষ্ঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকার দিচ্ছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার আমানত শেয়ারে রূপান্তর করা হবে।

