মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) খাতে প্রায় ২৪৫ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ আনতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের এমক্যাশ সেবায় ৪৯ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ঘিরে আর্থিক বাজারে জটিল প্রশ্ন ও তর্ক তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বয়স, একই নামে নতুন কোম্পানি নিবন্ধন, বোর্ড সভা এগিয়ে নেওয়া এবং বিনিয়োগের উৎস সম্পর্কিত তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব এই বিতর্কের মূল কারণ।
ইসলামী ব্যাংক এটি কৌশলগত বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে দেখালেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে নতুন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না–তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বি১০০ হোল্ডিংস এলএলসি এমক্যাশে ২৪৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকার বিদেশি মুদ্রা বিনিয়োগ করবে। বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি এমক্যাশের সর্বোচ্চ ৪৮.৯৯ শতাংশ শেয়ার পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানিতে কমপক্ষে ৫১ শতাংশ মালিকানা একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের হাতে থাকতে হবে। সেই নিয়ম মেনে এমক্যাশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা রাখবে ইসলামী ব্যাংক। নতুন বিনিয়োগের ফলে এমক্যাশের পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে ব্যাংক জানিয়েছে।
প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া
তদন্তে দেখা গেছে, এমক্যাশের প্রায় ৪৯ শতাংশ শেয়ার যে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হচ্ছে–বি১০০ হোল্ডিংস এলএলসি–তা খুব নতুন। কোম্পানিটির বয়স মাত্র দুই মাস ১৮ দিন। দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্মের অর্ধেক শেয়ার নতুন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
একই সময়ে B100 M-Cash SPV নামে আরেকটি কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে, যেখানে সরাসরি এমক্যাশের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তবে শেয়ার হস্তান্তরের চুক্তি হয়েছে মূল বি১০০ হোল্ডিংসের সঙ্গে, নতুন কোম্পানির সঙ্গে নয়। কেন এই আলাদা কাঠামো নেওয়া হয়েছে–এও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তদন্তে আরও জানা গেছে, উভয় প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা একই স্থানে। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, পুরো বিনিয়োগ কাঠামোটি পূর্বপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হতে পারে।
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা ১০ মার্চ হওয়ার কথা থাকলেও তা এগিয়ে ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভাতেই এমক্যাশে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্ধারিত সময়ের আগেই নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা
অনলাইন তথ্য অনুযায়ী, বি১০০ হোল্ডিংসের কর্মী সংখ্যা ১১ থেকে ৫০ জনের মধ্যে এবং লিঙ্কডইনে তাদের পেশাদার নেটওয়ার্ক খুব সীমিত। ফলে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগের আর্থিক সক্ষমতা ও উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘এমক্যাশ ইসলামী ব্যাংকের একটি সেবা, আলাদা সহযোগী প্রতিষ্ঠান নয়। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন। আবেদন করলে আমরা সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগ উৎস যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেব।’’
এমক্যাশ গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় বড় ধরনের শেয়ার হস্তান্তরের আগে বিনিয়োগকারীর প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তদন্ত ও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। কারণ এটি শুধু একটি কোম্পানির বিনিয়োগ নয়, বরং দেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবার স্বচ্ছতা ও জনআস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

