বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাঁকে এমন একজন গভর্নর হিসেবে মনে রাখবেন, যিনি সবচেয়ে বেশি সমালোচিত এবং ধিক্কৃত। তাঁর বিদায়ের দুই সপ্তাহের মধ্যে ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ফিরে এসেছে স্বস্তি।
অনেকে বলছেন, আহসান এইচ মনসুরের বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সাধারণত শান্তিপ্রিয় এবং পেশাদার। তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সময় নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়া কখনোই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ান না। রাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই)’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সারা বিশ্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে সাধারণ সভা বা সমাবেশ করা সীমিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এটি মেনে চলেন। কিন্তু কখনো কখনো, স্বার্থের সংরক্ষণের জন্য তাদের বাধ্য হতে হয় আন্দোলনে। সাবেক গভর্নরের সময় ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল।
তাঁর অযৌক্তিক ও একগুঁয়েমি নীতি ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল। বিদায়ের দিন তাঁকে কার্যত ঘরে ঢুকে বাইরে বের করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত পরিচালক উপদেষ্টা তাঁর গাড়িতে ওঠার সময় নেতৃত্ব দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকে মোট ৯টি ক্লাব ও সমিতি রয়েছে। এর মধ্যে সহকারী পরিচালক ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। ক্যাশ অফিসারদের জন্য রয়েছে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। এছাড়া সব ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্লাব। সবাই আহসান এইচ মনসুরের চলে যাওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “আহসান মনসুর কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকেরই ক্ষতি করেননি, গোটা ব্যাংকিং সিস্টেম এবং দেশের অর্থনীতিরও ক্ষতি করেছেন।” অন্য একজন কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, এর আগে কয়েকজন গভর্নর ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য সমস্যার মুখে পড়লেও এত বড় গণপ্রতিরোধ কখনো হয়নি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে হেনস্তা করার ঘটনা প্রথমবার ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সদ্য ক্ষমতাসীন হয়। গভর্নর ছিলেন খোরশেদ আলম, যিনি ১৯৯২ সালের ২০ ডিসেম্বর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৯৬ সালের ২১ নভেম্বর তাঁর নিয়োগ বাতিল ঘোষণা করা হয়। একই দিনে লুৎফর রহমান সরকারকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সাবেক গভর্নরকে ঘেরাও করেন। নতুন গভর্নরকে স্বাগত জানানো হলেও সাবেক গভর্নরকে ভবন থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি। পরে নতুন গভর্নরের আশ্বাসে সাবেক গভর্নর নিরাপদে অফিস ত্যাগ করতে সক্ষম হন।
২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ২০০৯ সালের ১ মে পর্যন্ত সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। তাঁর বিদায়কালে ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাঁকে ঘিরে অবস্থান নেন এবং বিভিন্ন দাবি আদায়ের চেষ্টা করেন। তিনি কিছু সময় পর অন্য গেটে দিয়ে নিরাপদে বের হন।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতের ঘটনা এবং আহসান মনসুরের সময়কার ঘটনার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। পূর্বে আন্দোলন ব্যাংকের স্বার্থ সংক্রান্ত দাবি নিয়ে হলেও, এবার আন্দোলন হয়েছিল গভর্নরের দেশবিরোধী ও স্বৈরশাসনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বজায় থাকুক। কিন্তু আহসান মনসুর শুরু করেছিলেন স্বৈরশাসন। আমাদের কিছু ন্যায্য দাবি তিনি গ্রহণ করেননি। বরং দমন ও নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছেন।”
অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের অভিযোগ, আহসান মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে বাস্তবজ্ঞানহীন ও ব্যয়বহুল পরামর্শকদের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা ব্যাংকের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়।
কাউন্সিলের চিঠিতে বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রবেশদ্বারগুলো তালাবদ্ধ করা এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ করার কারণে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তারা এটিকে নজিরবিহীন ও অপমানজনক ঘটনা বলে মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, আহসান মনসুর গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল ও ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর স্বেচ্ছাচারিতায় ব্যাংকের ঐতিহ্য নষ্ট হয়েছে।
কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মনে করেন, আহসান মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংককে এমনভাবে পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন যেন এটি একটি এনজিও হয়ে যায়। এ কারণে তিনি ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণিত ও ধিক্কৃত গভর্নর হিসেবে বিবেচিত হবেন বহু বছর।

