চলতি অর্থবছরে বিদেশি রেমিট্যান্সের প্রভাবে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই–জানুয়ারি পর্যন্ত চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ডলার, যা ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৬২ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল ১৩১ কোটি ডলার।
বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণের কারণে আর্থিক হিসাবেও উন্নতি হয়েছে। এর প্রভাবে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের আমদানি ব্যয় হয়েছে ৩,৯৮৮ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৬০ শতাংশ বেশি। তবে রপ্তানি আয়ের পতন ঘটেছে, তা এক দশমিক ১০ শতাংশ কমে দুই হাজার ৬০৯ কোটি ডলার হয়েছে। এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৩৭৯ কোটি ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১,১৭৪ কোটি ডলার।
প্রবাসীদের রেমিট্যান্সও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স হয়েছে ১,৯৪৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। রপ্তানি আয় কমলেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি হিসাব থেকে ২০০ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এটি মাত্র ৩৩ কোটি ডলার ছিল। বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণের বৃদ্ধি এই উদ্বৃত্তে বড় অবদান রেখেছে।
এসবের প্রভাবে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ২২৮ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ১২২ কোটি ডলারের ঘাটতি ছিল। এ পরিস্থিতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। জানুয়ারি শেষে গ্রস রিজার্ভ হয়েছে ৩৩.১৮ বিলিয়ন ডলার, আর বিপিএম-৬ অনুযায়ী ২৫.৩০ বিলিয়ন ডলার।
চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট হলো দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে অন্তর্ভুক্ত হয় পণ্য ও সেবার নিট বাণিজ্য, বিদেশ থেকে আসা আয় এবং রেমিট্যান্স।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানিতে আগের সরকারের সময় কড়াকড়ি থাকলেও বর্তমানে তা নেই। এর ফলে আমদানি চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক পতনের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। তবে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমিয়ে এনেছে।
আমদানি বাড়ার একটি ইতিবাচক দিক হলো, মূলধনি পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূলধনি পণ্যের আমদানি প্রায় ১৪.৫৫ শতাংশ বেড়ে ১২১ কোটি ডলার হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “প্রথম সাত মাসে সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্য স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। রপ্তানি কমা এবং আমদানি বৃদ্ধির পরও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি গত বছরের তুলনায় কমেছে। তবে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে প্রভাব ফেলতে পারে।”
এদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর ইতিমধ্যেই চাপ পড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডলারের দাম ৭০ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে, যেখানে আগের সপ্তাহে ছিল ১২২.৩০ টাকা।
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, “যুদ্ধের প্রভাব মার্চ থেকে স্পষ্ট হতে পারে। এতে চলতি হিসাবের ভারসাম্য বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক রিজার্ভ সংরক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”

