দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য শিল্পকারখানার শ্রমিকদের মধ্যে এখনও অনেকেই ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস পাননি। সরকারি নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও গত রোববার পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকা কারখানার সংখ্যা কমেনি।
সরকার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করেছে। তবে শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করছেন, কিছু মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে নির্ধারিত সময়মতো বেতন ও বোনাস পরিশোধ করেন না। এর ফলে বহু শ্রমিক অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
অন্যদিকে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অধিকাংশ কারখানা ইতোমধ্যে গত মাসের বেতন-ভাতা দিয়েছে। বোনাসও আগামী বুধবারের মধ্যে প্রদান করে ছুটি শুরু হবে।
বেতন-বোনাসের অবস্থা
দেশের ১০ হাজার ১০০টি শিল্পকারখানা শিল্প পুলিশের তদারকিতে আছে। সংস্থার তথ্যানুযায়ী, রোববার পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৩৪টি কারখানা (৬৮ শতাংশ) বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে, বকেয়া আছে ৩ হাজার ২৬৬টি (৩২ শতাংশ)। বকেয়া কারখানার মধ্যে পোশাক কারখানা ৭১৮টি, বস্ত্রকল ১৫৮টি, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের কারখানা ১০টি, পাটকল ৪টি এবং অন্যান্য ২ হাজার ৩৭৬টি।
ঈদ বোনাসও পুরোপুরি দেওয়া হয়নি। ১০ হাজার ১০০ কারখানার মধ্যে ৩ হাজার ৬৯২টি (৩৬ শতাংশ) বোনাস দিয়েছে, বাকি ৬ হাজার ৪০৮টি (৬৩ শতাংশ) প্রতিষ্ঠান বোনাস দেননি।
সরকারি নির্দেশনা ও ঋণ সুবিধা
৩ মার্চ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের সভায় শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি বেতন ৯ মার্চ এবং ঈদ বোনাস ১২ মার্চের মধ্যে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বৈঠকের এক সপ্তাহ আগে রপ্তানিমুখী শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতারা অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঈদের আগে দুই মাসের সমপরিমাণ বেতন অগ্রিম ঋণ প্রদানের অনুরোধ করেন। এর পর বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সচল ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানরা এক মাসের বেতনের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা পাবে।
এছাড়া চলতি মাসে রপ্তানিমুখী খাতের বকেয়া ২,৫০০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবছর ঈদের আগে বেতন-ভাতা বকেয়াকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের বিক্ষোভ দেখা যায়। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। ৯ মার্চ ময়মনসিংহের ভালুকায় রাসেল অ্যাপারেলস লিমিটেডের শ্রমিকরা বেতন ও বোনাসের দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন।
গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সেঞ্চুরি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বকেয়া বেতন ও ওভারটাইমের মজুরি দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর ৮৩২টি সচল কারখানার মধ্যে প্রায় অর্ধেক ঋণ নিয়ে বেতন দিয়েছে। এখনও ৩০-৩৫ শতাংশ কারখানা বেতন দেয়নি।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, ‘বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিয়ে বড় কোনো জটিলতা নেই। কিছু কারখানা ব্যাংক ঋণ পেলেও জটিলতায় পরিশোধ করতে পারেনি। অধিকাংশ কারখানা বৃহস্পতিবারের মধ্যে বেতন ও বোনাস দিয়ে ছুটি দেবে।’
ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিজিএমইএর ২,১২৭টি সচল কারখানার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ২,০৪৬টি কারখানা ফেব্রুয়ারি বেতন দিয়েছে। বাকি ৮১টি কারখানা এখনও বকেয়া। ঈদ বোনাস দিয়েছে ১,৮৮০টি কারখানা। চলতি মাসের বেতনের কিছু অংশ অগ্রিম দিয়েছে ৯টি এবং জানুয়ারি বেতন বকেয়া আছে ৫টি কারখানায়।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘কিছু নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানা সময়মতো বেতন দিতে পারেনি। তবে বাকি কারখানাগুলো আগামী তিন দিনের মধ্যে বেতন-বোনাস দিয়ে ছুটি শুরু করবে।’
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, ‘কিছু মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে বেতন-বোনাস বিলম্ব করেন। এতে শ্রমিকরা উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে থাকেন। সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিলে এই সমস্যা এড়ানো সম্ভব।’

