দেশের বিদ্যমান কর কাঠামোয় প্রত্যক্ষ করের তুলনায় ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত শুধু বিশ্ব মানদণ্ডেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে নিচের দিকে রয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বারবার ব্যর্থ হওয়ায় অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের আয়োজিত “উৎপাদনশীলতা সংস্কারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার: প্রাক-বাজেট অগ্রাধিকার” শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশে উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ বাড়লেও বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আয় বাড়ানোর কথা থাকলেও দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন খাতে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব এবং গোষ্ঠীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সুবিধা বা ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে বড় অন্তরায় হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আসন্ন বাজেট নিয়ে তিনি বলেন, শুধু বড় আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি নিলেই হবে না, প্রকল্প নির্বাচনে দক্ষতা ও বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বছরের পর বছর প্রকল্প ঝুলে থাকা, ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
ব্যাংক খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, সরকার যখন বেশি ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়। এতে নতুন বিনিয়োগ কমে যায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হয়।
মূল্যস্ফীতিকে বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সংকট উল্লেখ করে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলেই হবে না, সরকারেরও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের চাপ, ভূরাজনৈতিক সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তিনি জানান, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এখনও সীমিত হলেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির তুলনায় তা সন্তোষজনক।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির কিছু উন্নতি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কেবল সামষ্টিক স্থিতিশীলতা নয়, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
আলোচনায় পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, মোট সরকারি ব্যয়ের ২১ দশমিক ৪ শতাংশ এখন শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে, যা উন্নয়ন ব্যয়কে সংকুচিত করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া সম্প্রসারণমূলক বাজেট গ্রহণ করলে মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে বাস্তবভিত্তিক ও দক্ষ রাজস্ব নীতি প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ। অর্থনীতিবিদদের মতে, আসন্ন বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ কমিয়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

