পরিসংখ্যান বলছে, তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি গত পাঁচ মাস ধরে কমছে। একই সময়ে ইউরোপের বাজারে পণ্যের দামও কিছুটা নিচে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে নতুন বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তারা মনে করছেন, যদি উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করে, তাহলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে তাদের প্রধান বাজারগুলোতে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুল্ক-সংক্রান্ত পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। এতে ভোক্তারা কম খরচ করতে পারবে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যেতে পারে। এটি রপ্তানি খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। তবে বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহকারী বিদেশি ক্রেতাদের প্রতিনিধিরা মনে করেন, নতুন শুল্ক ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক প্রভাব খুব বেশি হবে না। তবে বাণিজ্য উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত রোববার ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিকরা জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে তারা ৯৩ বিলিয়ন ইউরো (১০৮ বিলিয়ন ডলার) সমমূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা পুনরুজ্জীবিত করার বিষয় আলোচনা করেন। গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তির পর পরিকল্পনাটি স্থগিত রাখা হয়েছিল।
শনিবার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ঘোষণা দেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। সংবাদমাধ্যমে আরও বলা হয়েছে, ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রিনল্যান্ড বিক্রি না করলে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুল্ক নিয়ে এই ধরনের বিরোধ কেবল আটলান্টিকের দুই পারের বাণিজ্যকেই নয়, গোটা বিশ্ব বাণিজ্যকেও অস্থিতিশীল করতে পারে।
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম ফিরোজ বলেন, ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বাড়লে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। “মূল্যস্ফীতি বাড়লে ভোক্তারা কম কিনবে। এতে আমাদের ওপর চাপ বাড়বে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে,” বলেন তিনি।
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীও সতর্ক করে বলেন, বাণিজ্য উত্তেজনা তীব্র হলে আমদানি কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ রপ্তানি হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্কের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কিছুটা বাধার মুখে পড়েছে। ফলে ইউরোপের বাজারে পণ্যের দামও কমেছে।
ফিরোজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক আরোপ করার কারণে ওই দুই দেশ ইউরোপে বিক্রি বাড়াতে চাইছে। এতে বাংলাদেশকে ইউরোপে বাড়তি চাপে পড়তে হচ্ছে। অনেক রপ্তানিকারককে পণ্যের দাম কমাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের ইউরোস্ট্যাট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরোপে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশি পোশাকের গড় দাম ২.০৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর পোশাকের দামও কমেছে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও সাবেক বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সদস্য মোস্তফা আবিদ খান বলেন, স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি বা আমদানিতে বড় নেতিবাচক প্রভাব দেখছেন না।
শুল্কসংক্রান্ত সর্বশেষ ঘোষণার আগে, ইইউভুক্ত দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পণ্যের ওপর শুল্ক ০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। যুক্তরাজ্যের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক ১০ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য প্রবেশে শুল্ক ছিল ৬ শতাংশ। ইইউর তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে অনেক পণ্য শুল্কমুক্তভাবে ইউরোপে রপ্তানি করা যাচ্ছে।
রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ সত্ত্বেও বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য সোর্সিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব দেখছেন না। সুইডেনভিত্তিক একটি ব্র্যান্ডের ঢাকা অফিসের কর্মকর্তা বলেন, সম্ভাব্য শুল্ক হলেও বাংলাদেশের রপ্তানিতে তা বড় প্রভাব ফেলবে না। “আমরা বছরে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য নিয়ে থাকি। অর্ডারের ফ্লো স্বাভাবিক আছে। বরং কিছুটা বাড়তে পারে।”
একইভাবে জার্মানিভিত্তিক একটি স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার জানান, শুল্ক আলোচনা নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর। বাংলাদেশের ওপর প্রভাব কম। “দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি কী হবে, তা এখনও বলা যাচ্ছে না।”

