ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারতের মধ্যে একটি বৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। মানুষ এটিকে ‘মাদার অব অল ডিলস’ হিসেবে অভিহিত করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, চুক্তিটি দুই অঞ্চলের জনগণের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করবে।
গতকাল ভারতের গোয়ায় ইন্ডিয়া এনার্জি উইক ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদি এই চুক্তিকে দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে সহযোগিতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এফটিএ চুক্তি তৈরি পোশাকভিত্তিক রফতানির উপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রফতানিকারকরা বলছেন, ইইউ ও ভারতের মধ্যে এই চুক্তির কারণে যদি বাংলাদেশ প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে ইউরোপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার হারানোর সম্ভাবনা আছে। তবে তারা আশ্বস্ত করছেন, ২০২৯ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া পর্যন্ত এ চুক্তির তেমন কোনো প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে না।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ও ইইউর নতুন চুক্তির প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। কারণ এর গুরুত্বপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশের পোশাক খাতে পড়তে পারে। চুক্তির মাধ্যমে ভারত পোশাক রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে পারে। দেশটির স্থানীয় সুতা ও কাপড় শিল্পের সক্ষমতা অনেক বড় ও শক্তিশালী। ফলে ভারতের পণ্য আমদানি করার সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের উৎপত্তিস্থল বা ‘রুলস অব অরিজিন’ শর্ত পূরণ করা সহজ হবে।
অন্যদিকে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইইউতে বাংলাদেশের বাজার সুবিধা এখনো নিশ্চিত নয়। যদি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ কোনো সুবিধা না পায়, তবে পোশাক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্র্যাজুয়েশনের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তবে জিএসপি প্লাস পেলেও পোশাক পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। কারণ ইইউর ‘রুলস অব অরিজিন’-এর শর্ত সীমার চেয়ে বাংলাদেশের রফতানি অনেক বেশি। এ সীমা পূরণে ব্যর্থ হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যদি জিএসপি প্লাসের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে সমতাসূচক অবস্থান তৈরি হবে। তবে ভারতের স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্প অনেক শক্তিশালী হওয়ায় প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করতে হবে আরও বেশি।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (আরএপিআইডি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলছেন, ভারত ও ইইউর নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পর বাংলাদেশকে দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে। তিনি বলেন, “এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকেও ভালো একটি ডিল নিশ্চিত করতে হবে। না হলে মারাত্মক প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। ভারত-ইইউ চুক্তি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বাইরে বেশি কিছু নেই। ইউরোপে সবচেয়ে বেশি রফতানি হয় পোশাক পণ্যে। তাই এই চুক্তির কারণে আমাদের পোশাকের প্রতিযোগিতা অনেক বাড়বে। একই সঙ্গে যদি জিএসপি সুবিধার শর্ত অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্র হবে। তাই এখনই ইইউর সঙ্গে বসে নিশ্চিত করতে হবে যে বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা পাবে এবং পোশাকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে। জিএসপি প্লাসের রুলস অব অরিজিনের দুই স্তরের শর্তকেও এক স্তরে আনা দরকার।”
গতকাল প্রকাশিত ইইউর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত একটি ঐতিহাসিক, উচ্চাভিলাষী এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা সম্পন্ন করেছে। এটি উভয় পক্ষের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় এফটিএ। এ চুক্তি বিশ্বের দ্বিতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ককে আরও গভীর করবে, যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। এটি উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যের প্রতি অঙ্গীকারকেও তুলে ধরছে।”
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, “আজ ইইউ ও ভারত ইতিহাস সৃষ্টি করল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই গণতন্ত্রের অংশীদারিত্ব আরও গভীর হলো। আমরা ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করেছি, যেখানে উভয় পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। এটি শুধু একটি শুরু, আমরা এই সাফল্যের ওপর ভর করে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করব।”
বর্তমানে ইইউ ও ভারতের মধ্যে বছরে ১৮০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি পণ্য ও সেবার বাণিজ্য হয়। এটি ইইউর প্রায় আট লাখ কর্মসংস্থানকে সমর্থন করছে। এ চুক্তির ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে ইইউর পণ্য রফতানি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ভারতে ইইউর ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বাতিল বা কমানো হবে। এর ফলে বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে।
ইইউর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এফটিএ আলোচনার প্রথম রাউন্ড শুরু হয় ২০০৭ সালে। ২০১৩ সালে আলোচনা স্থগিত হয় এবং ২০২২ সালে পুনরায় শুরু করা হয়। শেষ (১৪তম) আনুষ্ঠানিক আলোচনার রাউন্ড হয় ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে। একই সঙ্গে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকদের মধ্যে এফটিএর ঘোষণায় শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি অঞ্চলই ইইউ। মোট পণ্য রফতানির ৮১ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে। সুতা ও কাপড় উৎপাদনে শক্তিশালী ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় বেড়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, “আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। সরকার এখনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তারা মনে করছে, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশের কিছু হবে না। ভারতের মতো এফটিএ করতে আমাদেরও সময় লাগবে। ফেব্রুয়ারিতেই আবেদন করে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন তিন বছরের জন্য পিছিয়ে দিলে অন্তত ছয় বছর সময় পেতাম ইইউর সঙ্গে এফটিএ করতে। ভারত ৯-১০ বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় এফটিএ করেছে। আমাদেরও অন্তত নয় বছর লাগবে। এফটিএ কার্যকর হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্যের ২৪ শতাংশ গ্যাপ তৈরি হবে। শুল্ক নির্ধারণেও ভারতে সুবিধা থাকবে, বাংলাদেশকে শুল্ক দিতে হবে। গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার বিষয়ে ইতিমধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। তিনি বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিক থেকে সম্মতি পেলে আলোচনা শুরু হবে। বেশি দেরি হবে না। ভারতের সঙ্গে আলোচনায় ইইউ যতটা সময় নিয়েছে, তা স্বাভাবিক নয়।”
ইউনিয়ন-ভারত চুক্তি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকে প্রভাব ফেলবে কি না, এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা এমনটা মনে করছি না। আমরা ইইউতে জিএসপি প্লাস সুবিধা এবং এফটিএ—উভয় ক্ষেত্রেই চেষ্টায় আছি। আশা করি দ্রুত আলোচনা সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশে ইইউর রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করেও আগ্রহ দেখা গেছে।”
ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে ইইউর পোশাক আমদানির অর্থমূল্য ছিল যথাক্রমে ১,৮২৭ কোটি ও ৪১৮ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের ১১ মাসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১,৮০৫ কোটি ও ৪২৪ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৭.৬৫ ও ৮.৩১ শতাংশ।
পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন, দুই দেশের রফতানিতে এখনো বড় পার্থক্য আছে। আপাতত বাংলাদেশের ওপর ভারত-ইইউ এফটিএর কোনো প্রভাব পড়ছে না। তবে যদি বাংলাদেশ সময়মতো এফটিএ করতে ব্যর্থ হয়, দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের বাজার হারানোর সম্ভাবনা থাকবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, “এখন কোনো ক্ষতি হবে না। আমরা শূন্য শুল্কে রয়েছি। এটি ২০২৯ সাল পর্যন্ত চলবে। এই সময়ে আমাদের দ্রুতগতিতে প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (পিটিএ) এবং এফটিএ করতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিয়েছে, এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ভারতের এফটিএ করতে ১৯ বছর লেগেছে, আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে হাতে চার বছর সময় আছে। এই সময়ে বাংলাদেশ চুক্তি করতে পারলেই বাজার টিকবে। না হলে ২০২৯ সালের পর বাজার হারানোর ঝুঁকি থাকবে।”
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বস্ত্র খাতে আগ্রাসী শিল্পনীতি গ্রহণ করেছে। কম দামে জমি, বিক্রয়ের ওপর আয়করের অব্যাহতি, দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ আর্থিক সুবিধা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে ভারতের মিলগুলো প্রতি কেজি সুতা রফতানিতে উৎপাদন খরচের তুলনায় ৪০-৫০ সেন্ট কম দামে বাংলাদেশে পণ্য রফতানি করছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্থানীয় মিলগুলো প্রতিযোগী দেশের প্রণোদনা প্রদত্ত মূল্যের সঙ্গে টিকতে পারছে না। ফলে উদ্যোক্তারা অসুবিধার মধ্যে পড়ছেন এবং বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৈরি পোশাকের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজের এই ভঙ্গুরতা ভারত-ইইউ এফটিএ কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশের শঙ্কা আরও বাড়াবে।
আরএপিআইডি চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্পকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করতে হবে। যুক্তরাজ্য সম্প্রতি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা এবং তৈরি পোশাকে সিঙ্গেল স্টেজ সুবিধা রেখেছে। এতে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সমতা থাকবে। আমাদেরও ইইউর সঙ্গে এমন সুবিধা আদায় করতে হবে এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নীতি কার্যকর করতে হবে, যাতে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতায় দাম কমানোর চাপ না পড়ে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশে ইইউ ডেলিগেশন সূত্রে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ইইউ বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের কার্যালয়ে একটি চিঠি পাঠান। এতে বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের ১৩টি চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম পাঁচটি অশুল্ক বাধা সম্পর্কিত, বাকি আটটি নিয়ন্ত্রক বা নীতিগত সমস্যার সঙ্গে যুক্ত।
ইইউ-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “চিঠিতে উল্লেখিত উদ্বেগগুলো বিবেচনায় নিলে ইইউ বুঝবে যে বাংলাদেশ এফটিএর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের পথে অগ্রসর হয়, তবে এফটিএর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।”

