চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতির প্রভাব এখন আর বন্দর এলাকার মধ্যে আটকে নেই। দ্রুতই এই অচলাবস্থা পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে। এর সরাসরি অভিঘাত পড়তে শুরু করেছে জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আমদানি–রপ্তানি, বাজার সরবরাহ ও মূল্যস্তিতিশীলতা—সবকিছুই বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কাজ বন্ধ থাকায় বন্দরে কনটেইনার জট দিন দিন বাড়ছে। আমদানি পণ্য খালাসে গতি কমে গেছে। রপ্তানি চালান নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পাঠানো যাচ্ছে না। এর ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে স্টোরেজ চার্জ, জাহাজের ডেমারেজ এবং ট্রাকের জরিমানা। সামনে রমজান মাস থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে, যা বাজারে দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সরকারের লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এই কর্মবিরতি শুরু হয়। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের ডাকে গত শনিবার এবং গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা দুই দিন কাজ বন্ধ ছিল। গতকাল শ্রমিক নেতারা আজও একই সময়সূচিতে কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দেন। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
সাধারণত প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দরে ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। চলমান অচলাবস্থায় এই সংখ্যা কমে অন্তত ৫ হাজার টিইইউতে নেমেছে। একই সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার টিইইউ কনটেইনারের ডেলিভারি বন্ধ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে বন্দরের ভেতরে ও আশপাশের ইয়ার্ডগুলোতে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে। আমদানি ও রপ্তানিমুখী পণ্যবোঝাই পাঁচ হাজারের বেশি যানবাহন আটকে পড়েছে।
এই বিঘ্নের আর্থিক চাপ দ্রুত বেড়ে চলেছে পুরো লজিস্টিকস শৃঙ্খলে। আমদানিকারকদের প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত ২৪ থেকে ১৯২ ডলার পর্যন্ত স্টোরেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে। জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় পিছিয়ে যাওয়ায় শিপিং লাইনগুলোর প্রতিটি জাহাজে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ বা ক্ষতিপূরণ মাশুল যোগ হচ্ছে। অন্যদিকে, বন্দরের ভেতরে আটকে থাকা প্রতিটি ট্রাকের জন্য পরিবহন অপারেটরদের প্রতিদিন ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। তার প্রভাব গিয়ে পড়বে উৎপাদন, রপ্তানি আয় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে।
ব্যবসায়ীদের সংশয়:
ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলছেন, বন্দরের এই অচলাবস্থায় যে অতিরিক্ত খরচ তৈরি হচ্ছে, তা কেবল লজিস্টিকস ব্যবস্থার ভেতরেই আটকে থাকে না। ধাপে ধাপে সেই চাপ শিপিং লাইন থেকে আমদানিকারক, সেখান থেকে পাইকার হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধেই গিয়ে পড়ে। ফলে রমজানের ঠিক আগমুহূর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার শঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
আমদানিকারক ও কাস্টমস এজেন্ট আকরামুল হক মামুন বলেন, অতিরিক্ত খরচ কখনো হারিয়ে যায় না। শেষ পর্যন্ত তা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ভোক্তাদেরই তা বহন করতে হয়। তার মতে, এই চাপ ধীরে ধীরে পুরো বাজার ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রপ্তানি খাতেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, দীর্ঘ চেষ্টার পর সরকার সম্প্রতি বন্দরের জট কিছুটা কমাতে পেরেছিল। কিন্তু আবারও বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় আমদানি ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে রপ্তানিমুখী চালানগুলো জাহাজের নির্ধারিত সময়সূচি মিস করবে। কারণ জাহাজ অপেক্ষা করে না। সময়মতো পণ্য পাঠানো না গেলে অর্ডার বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন বিদেশি ক্রেতারা মূল্যছাড় দাবি করতে পারেন, অথবা রপ্তানিকারকদের কয়েক গুণ বেশি খরচে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হতে হতে পারে। তার ভাষায়, এসব পরিস্থিতির যেকোনো একটিতে পড়লে কোনো রপ্তানিকারকের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব। তিনি জানান, দ্রুত সমাধানের জন্য সরকার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আমদানিকারকদের চাপের চিত্র তুলে ধরে চট্টগ্রাম ফ্রেশ ফ্রুট ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম বলেন, বন্দর থেকে একটি কনটেইনার ছাড় করতে মাত্র এক দিন দেরি হলেই আমদানিকারকের অতিরিক্ত ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এই ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ভোক্তাদের ওপরই চাপ সৃষ্টি করে।
এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোতেও। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিকদার জানান, ধর্মঘটের পর রপ্তানি ডেলিভারি শুক্রবারের ২ হাজার ৯৪১ টিইইউ থেকে শনিবারে কমে ১ হাজার ৬১০ টিইইউতে নেমে এসেছে। একই সময়ে আমদানি ডেলিভারি ১ হাজার ৪১০ টিইইউ থেকে কমে মাত্র ৬০০ টিইইউতে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে ডিপোগুলোর কার্যক্রম ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে। গতকাল সকালে বন্দরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালগুলো অস্বাভাবিকভাবে নীরব। গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই দশকে এমন দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেননি।
পরিবহন খাতে জরিমানার বোঝা:
পরিবহন খাতেও এই অচলাবস্থার সরাসরি চাপ পড়েছে। পরিবহন মালিকরা জানান, বন্দরে গাড়ি আটকে থাকায় জরিমানার তাৎক্ষণিক বোঝা তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। যদিও শেষ পর্যন্ত এই অতিরিক্ত খরচ আমদানিকারকদের কাছ থেকেই আদায় করা হয়। এর ধারাবাহিক প্রভাব গিয়ে পড়ে বাজারে পণ্যের দামে।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইম মুভার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহমদ বলেন, প্রথম ধাক্কাটা পরিবহন মালিকদের ওপর এলেও এই খরচ এখানেই থেমে থাকে না। শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকদের কাছ থেকে তা আদায় করা হয়, আর পরবর্তী ধাপে সেই ব্যয় ভোক্তাদের ওপরই চাপানো হয়।
রমজানকে সামনে রেখে সরবরাহে উদ্বেগ:
রমজান শুরু হতে আর ২০ দিনেরও কম সময় বাকি থাকায় ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্বেগ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। তারা আশঙ্কা করছেন, যদি চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, “দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে সামান্য সময়ের বিঘ্নও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এখানে কয়েক ঘণ্টারও বিঘ্ন পুরো অর্থনীতিতে ঢেউয়ের মতো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।” তিনি জরুরি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান।
বদলি সংক্রান্ত অস্থিরতা:
এনসিটি চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে শনিবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঢাকার পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে বদলি করেছে। তাদের গতকাল সকালের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে বদলি হওয়া কর্মকর্তারা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে কর্মবিরতিতে অংশ নেন।
এরপর গতকাল বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) আরও ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলির সিদ্ধান্ত নেয়। সিপিএর প্রধান জনবল কর্মকর্তার জারি করা দুটি পৃথক অফিস আদেশের মাধ্যমে এই বদলি কার্যকর করা হয়েছে। সিপিএ কর্মকর্তারা জানান, বদলি হওয়া অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী বন্দরের অপারেশনালভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্বে ছিলেন, যা বন্দরের কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সিপিএ কর্মবিরতির প্রভাবকে কম দেখাচ্ছে:
তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) পরিস্থিতির প্রভাব কমিয়ে দেখাচ্ছে। গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিএর পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, আংশিক বিঘ্ন সত্ত্বেও বন্দরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি জানান, আগের দিন ১,০০০ টিইইউ ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও ১,৭০০ টিইইউ ডেলিভারির সূচি রয়েছে।
তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালু রাখতে প্রয়োজনীয় জনবল মোতায়েন করা হয়েছে এবং বন্দর অচল—এমন দাবি তিনি প্রোপাগান্ডা হিসেবে উড়িয়ে দেন। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগ না করার বিষয়ে তিনি জানান, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এনসিটি চুক্তি সরকারের সিদ্ধান্ত। সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে, সিপিএ তা বাস্তবায়ন করবে।” তবে সিপিএ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে কনসেশন চুক্তি কখন স্বাক্ষর হবে—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। তিনি উল্লেখ করেন, বিষয়টি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে।
শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য:
শ্রমিক নেতারা সিপিএর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আন্দোলনের সময় কোনো কার্যক্রমই হয়নি। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, এনসিটি বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এবং এখানে বিদেশি ব্যবস্থাপনার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং প্রশ্ন তোলেন—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হলো না কেন।
তিনি বলেন, “মাত্র ১১ দিনের মধ্যে দেশ একটি নির্বাচিত সরকার পেতে যাচ্ছে। তাহলে কেন এমন কৌশলগত সিদ্ধান্ত সেই সরকারের জন্য ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না?” আরেক শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, দুই দিন কর্মবিরতির পরও কর্তৃপক্ষ কোনো সংলাপে না গিয়ে ‘অযৌক্তিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ নিয়েছে।
তিনি সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নতুন কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়ে বলেন, “কর্তৃপক্ষ আমাদের কথা না শুনলে পরশুদিন [মঙ্গলবার] থেকে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচির ডাক দিতে পারি।

