বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে পতনের ধারা গত কয়েক মাস ধরে অব্যাহত রয়েছে। জানুয়ারি ২০২৬ মাসে রপ্তানি আয়ে শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। যদিও পতনের হার সামান্য কমেছে, বিশ্ব বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং প্রতিযোগিতা এ ধারা থামাতে পারছে না।
চলতি অর্থবছর ২০২৫–২৬ সালের জুলাই–জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমেছে। জুলাই–ডিসেম্বরের পতনের হার ছিল ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। ধারাবাহিক এই হ্রাস রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তারা মনে করছেন, যদি নেতিবাচক প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রধান রপ্তানি খাত, যেমন তৈরি পোশাক ও কৃষিপণ্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইনের জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্যারিফ নীতি বাংলাদেশের রপ্তানিতে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে, ফলে দেশীয় পণ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে সহজে প্রবেশ করতে পারছে না।
বিশ্বব্যাপী কম চাহিদা, ইউরোপীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ক্রেতারা অর্ডার কমিয়েছেন। এই সব কারণে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে—যেমন বাজার বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইন উন্নত করা এবং মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন বাড়ানো—তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রপ্তানি আয়ের চিত্রপট:
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৪.৪১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা গত বছরের একই সময়ের ৪.৪৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কম।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি অর্থবছর ২০২৫–২৬ সালের জুলাই–জানুয়ারি সময়ে দেশের মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ২৮.৪১ বিলিয়ন ডলার। এটি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ের ২৮.৯৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১.৯৩ শতাংশ কম। অর্থাৎ এই সময়ে মোট রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে জুলাই–জানুয়ারি ২০২৫–২৬ সময়ে আয় হয়েছে ২২.৯৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ২৩.৫৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২.৪৩ শতাংশ কম। এর মধ্যে নিটওয়্যার পণ্যের রপ্তানি কমে ১২.২৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ১২.৬৮ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৩.১৩ শতাংশ হ্রাস। ওভেন পণ্যের রপ্তানি ১০.৬৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছরের ১০.৮৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১.৬০ শতাংশ কম।
অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করছেন, রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রথমে বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজন ও মানোন্নত পণ্য উৎপাদনে ফোকাস, সরবরাহ চেইনের সমস্যার সমাধান যেমন লজিস্টিকস ও জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণ, এবং সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
যদিও প্রধান খাতগুলোতে পতন দেখা গেছে, কিছু খাতে রপ্তানি বেড়েছে। জীবিত ও হিমায়িত মৎস্য রপ্তানি চলতি সময়ে ২৯৭.৫৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ২৮৩.৫৪ মিলিয়নের তুলনায় ৪.৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি। এর মধ্যে চিংড়ি রপ্তানি ২০২৫–২৬ সালে ২০৩ মিলিয়ন ডলার, আগের বছরের ১৯৭ মিলিয়নের তুলনায় ৩.০৩ শতাংশ বেশি। তবে কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমে ৬০৭.২৮ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৬৭৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে এ খাতে ৯.৮৮ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের রপ্তানি আয় ১৩৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ১৩২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৫.০৩ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। তবে প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি ১৭৪ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ১৮২ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৪.৩২ শতাংশ হ্রাস হয়েছে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের খাতে মোট রপ্তানি হয়েছে ৭০৭ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪–২৫ সালের ৬৬৯ মিলিয়নের তুলনায় ৫.৭১ শতাংশ বেশি। কিন্তু খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। চামড়া রপ্তানি ৭১ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৭৪ মিলিয়ন ডলার, ফলে ৩.৪২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। অন্যদিকে চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ২২৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ১৯২ মিলিয়নের তুলনায় ১৯.২০ শতাংশ বৃদ্ধি। চামড়ার জুতা রপ্তানি সামান্য বেড়ে ৪০৭ মিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছরের ৪০৩ মিলিয়নের তুলনায় ০.৯৬ শতাংশ বেশি।
পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৪৯৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৪৮৪ মিলিয়ন ডলার, ফলে ১.৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে পাট সুতা ও টুইনের রপ্তানি বেড়ে ৩১৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের ২৭১ মিলিয়নের তুলনায় ১৬.০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
বিশেষায়িত টেক্সটাইল রপ্তানি ২০২৫–২৬ সালে কমে ২১২ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ২৩০ মিলিয়ন ডলার, ফলে ৭.৮০ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। হোম টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি বেড়ে ৫১০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, আগের বছরের ৪৯৪ মিলিয়নের তুলনায় ৩.২৬ শতাংশ বৃদ্ধি।
তবে নন-লেদার জুতার রপ্তানি ৩১২ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা আগের বছরের ৩১৮ মিলিয়নের তুলনায় ২.০৬ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে। উল্লিখনযোগ্যভাবে, বাইসাইকেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৮৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে আগের বছর ছিল ৬৩ মিলিয়ন ডলার, ফলে ৩১.১২ শতাংশ শক্তিশালী ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
কেন রপ্তানি নেতিবাচক প্রবণতায়?
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামিম এহসান বলেছেন, দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি মূলত বিশ্ব বাজারে দুর্বল চাহিদার কারণে নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্যারিফ নীতি বিশ্ব রপ্তানি বাজারে উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে, প্রভাবিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী দুর্বল চাহিদা, ইউরোপীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ক্রেতারা কম অর্ডার দিয়েছেন, যা সামগ্রিক রপ্তানিতে প্রভাব ফেলেছে।”
ফজলে শামিম এহসান আশা প্রকাশ করেছেন, “এই পরিস্থিতি আগামী কয়েক মাসও চলতে পারে। তবে যদি একটি সুষ্ঠু ও স্বাধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়, তাহলে রপ্তানি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হতে পারে।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, “বিশ্বব্যাপী চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। বাংলাদেশ এখনো মূলত সাধারণ, কম মূল্যের পণ্যের ওপর জোর দেয়ার কারণে মূল্য নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”
রুবেল আরও উল্লেখ করেন, “একই সময়ে, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বাজার যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অনৈতিহ্যবাহী বাজারে প্রতিযোগীরা আরও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে, যেখানে বাংলাদেশ আগের মতো শক্তিশালী অবস্থান রাখতে পারছে না। বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে কৌশলগত পরিবর্তন অত্যন্ত প্রয়োজন। এটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখতে এবং রপ্তানিতে ভালো পারফরম্যান্স নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।”
রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে করণীয়:
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মূল কারণ চাহিদা ও সরবরাহ—উভয় দিকের চ্যালেঞ্জ। তিনি উল্লেখ করেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বাজারে চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে চীনা ও ভারতীয় পণ্য ইউরোপে আগ্রাসীভাবে বিক্রি হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি মার্জিন কমেছে। সরবরাহ ক্ষেত্রে লজিস্টিকস, জ্বালানি এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও সমস্যা সৃষ্টি করেছে।”
ড. হোসেন মনে করেন, রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনার জন্য তিনটি মূল পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, উচ্চমূল্য সংযোজিত ও মানোন্নত পণ্যে ফোকাস। তৃতীয়ত, সরবরাহ চেইনের সমস্যা কমানো, যেমন লজিস্টিকস ও জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার মাধ্যমে রপ্তানিকারীদের সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, “নির্বাচনের পরে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে এবং বাজার চাহিদা পুনরায় বাড়লে রপ্তানি খাত ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরে আসতে পারবে। এই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে ট্যারিফ সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে এবং শুল্ক আরও কমানোর জন্য আলোচনা করা প্রয়োজন। একই সময়ে বন্দরের সক্ষমতা উন্নত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা সঠিক পথে ফেরাতে পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ক্রেতাদের আস্থা পুনঃস্থাপন করা সম্ভব।

