চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এ বছর রমজান শুরু হতে পারে ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারি। ইতিমধ্যে রোজার ভোগ্যপণ্য আমদানি ও মজুতের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির আভাস মিলেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্যের সরবরাহ ভালো থাকায় দামও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
তবে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক ও কর্মচারীদের আন্দোলন নতুন আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে। বন্দরে চলমান পরিস্থিতি ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে যেতে পারে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে, কারণ রমজানের ঠিক আগে দেশের নির্বাচনকালীন ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে কার্যদিবস রয়েছে কেবল সাত দিন। এ সময়ে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে ছোলা, ডাল, তেল, চিনি, খেজুরসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি বাজারের দামে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন ব্যবসায়ীরা।
বন্দরের শ্রমিক-শ্রমিকের ধর্মঘট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তা রমজানের জন্য ভোগ্যপণ্যের মজুতে ঘাটতি ও দাম বাড়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তারা ব্যবসায়ীদের সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করতে এবং বিকল্প আমদানি পথ তৈরি করতে পরামর্শ দিয়েছেন। বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এখন সময়নিষ্ঠ সমন্বয় ও সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। অনির্দিষ্টকালীন ধর্মঘট এবং ছুটি মিলিয়ে কম কার্যদিবসের মধ্যেও সরকারের উদ্যোগ, ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি এবং বন্দরের পরিচালনার সমন্বয় রোজার বাজারকে চাপমুক্ত রাখতে সহায়ক হতে পারে। ভোক্তা সংগঠনগুলো মনে করছে, বন্দরের চলমান সংকটকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পণ্যের দাম বাড়াতে পারে। এতে সাধারণ ভোক্তারা আর্থিকভাবে প্রভাবিত হবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার রোজার আগেই দায়িত্ব হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা চাইলে নির্বাচিত সরকার আসার পর তাদের দাবির বিষয়ে আন্দোলন করতে পারতেন। কিন্তু এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়সীমার কারণে এমন সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন, “রমজান সামনে রেখে পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য একটি চক্র কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। নানান সংস্থার প্রভাবও থাকতে পারে। রোজার আগে বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দাম বাড়বে এবং বাজার অস্থির হবে।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল কবীর সুজন জানান, “গত সপ্তাহে বন্দরের সংকটের কারণে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের জট তৈরি হয়েছে। আর মাত্র কয়েকদিন পরে রোজা। এই সময় ভোগ্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। ইতোমধ্যে রোজার জন্য আমদানি করা অনেক পণ্য বন্দরে পৌঁছেছে, তবে বহির্নোঙরে এখন কয়েকটি জাহাজ ভোজ্যপণ্য নিয়ে খালাসের জন্য অপেক্ষা করছে।

নির্বাচনের ছুটি ও বন্দরের ধর্মঘট মিলিয়ে কার্যদিবস কম হওয়ায় বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খল আরও চাপের মুখে পড়বে। সরবরাহ বিঘ্নিত হলে ছোলা, ডাল, তেল, চিনি, খেজুরসহ রোজার অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে পারে। তাই বন্দরের দ্রুত কার্যক্রম শুরু এবং বাজারে বিকল্প সরবরাহ চ্যানেল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তিনি আরো বলেন, শ্রমিকরা আজ থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করেছেন। এ বার তারা বহির্নোঙরেও কাজ বন্ধ রাখবেন, যা আগের কোনো আন্দোলনে হয়নি।
বহির্নোঙরে কাজ বন্ধ থাকলে বাল্কপণ্য খালাস করা সম্ভব হবে না। এতে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়তে পারে। চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম জানান, “রোজার পণ্যের সরবরাহ চেইনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দাম দ্রুত বাড়বে, যা সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।” গত সপ্তাহেও বহু জাহাজ থেকে খেজুরসহ আমদানি করা ফল খালাস করা সম্ভব হয়নি। যদি এ সপ্তাহের শুরুতে খালাস বন্ধ থাকে, তবে রোজার আগে ফলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়া নিশ্চিত।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ দেশের ভোগ্যপণ্যের দ্বিতীয় বৃহৎ পাইকারি বাজার। এখান থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ জেলায় পণ্য সরবরাহ হয়। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা ভোগ্যপণ্যের বড় অংশ খাতুনগঞ্জে বিক্রি হয়।
খাতুনগঞ্জের মসলা ও ডালজাতীয় পণ্যের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেকান্দর জানান, “বন্দরের শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে গত শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। এতে ছোলা, মটরসহ রোজার প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। রোববার থেকে পুনরায় ধর্মঘট শুরু হলে দাম আরও বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর, বিশেষ করে কম আয়ের মানুষদের রোজায় নতুন ভোগান্তিতে পড়তে হবে।” ধর্মঘটের কারণে বন্দরের কার্যক্রম স্থগিত থাকলে সরবরাহ শৃঙ্খল আরও চাপের মুখে পড়বে। রোজার আগে পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা বড়, যা ভোক্তাদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, “খাতুনগঞ্জে কাজ করা শ্রমিকদের বেশিরভাগ ভোলা, বরিশাল, বাগেরহাট অঞ্চলের। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে তারা নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে খাতুনগঞ্জে বেচাকেনা কমছে। তবে বন্দরের সংকটে আমদানি করা পণ্য খালাস ব্যাহত হলে, বিশেষ করে ভোগ্যপণ্যের খালাস বিঘ্নিত হলে বাজারে দাম বাড়বে। রোজার আগের দু-এক দিন চাহিদা বেশি থাকে। সরবরাহ কম হলে দাম দ্রুত বেড়ে যাবে।”
রমজানে খেজুরের চাহিদাও সাধারণত বেশি থাকে। দেশের চাহিদার প্রায় সবটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বন্দরে অপারেশনাল কাজ বন্ধ থাকলে জাহাজ থেকে খালাস সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে পাইকারিতে প্রায় সব ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম বলেন, “বন্দরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের কারণে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস আরও এক সপ্তাহ পিছিয়েছে। গত সপ্তাহেও অনেক জাহাজ থেকে খেজুরসহ আমদানি করা ফল খালাস করা সম্ভব হয়নি। এই সপ্তাহের শুরুতে খালাস বন্ধ থাকলে রোজার আগে ফলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যেই পাইকারিতে খেজুরের দাম ১০-২০ টাকা বেড়েছে।”
তিনি আরও জানান, “আমদানি করা ফল নির্ধারিত সময়ে বাজারে না এলে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হবে এবং দাম বাড়বে। তবে নির্ধারিত সময়ের পরে বাজারে এলে চাহিদা থাকবে না, ফলে আমদানিকারকরা লোকসান ভোগ করবেন।”
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন আরো বলেন, “কেমন জানি মনে হচ্ছে—রমজান সামনে রেখে পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য একটি চক্র কাজ করছে। নানান সংস্থার প্রভাবও থাকতে পারে। বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দাম বাড়বে। এ সুযোগে যেসব ব্যবসায়ীর গুদামে পণ্য মজুত রয়েছে, তারা দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণত এমন সুযোগ খোঁজে, এবং বন্দরের আন্দোলন তাদের জন্য সেই সুযোগ তৈরি করেছে।”
রমজানকে সামনে রেখে বন্দরের ধর্মঘট এবং নির্বাচনকালীন ছুটি মিলিয়ে কার্যদিবস কম হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খল চাপের মুখে পড়বে। ছোলা, ডাল, তেল, চিনি, খেজুরসহ রোজার প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে, বিশেষ করে কম আয়ের মানুষদের রোজায় নতুন ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
গত সপ্তাহে শনিবার জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি দিয়ে ধর্মঘট শুরু হয়। এরপর সোমবার বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার এবং মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বৃহস্পতিবার উপদেষ্টার আশ্বাসে ধর্মঘট দুদিন স্থগিত থাকলেও, শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চার দাবি জানান শ্রমিক নেতারা। এরপর রোববার থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহীম খোকন। শ্রমিকদের দাবিগুলো হলো:
- নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ না দেওয়ার সুস্পষ্ট সরকারি ঘোষণা।
- বন্দর চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামানকে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান পদ থেকে প্রত্যাহার।
- আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত বা পদাবনতি সম্পর্কিত নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল করা এবং প্রত্যেক কর্মচারীকে নিজ পদে পুনর্বহাল করা।
- আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, “খাতুনগঞ্জে কাজ করা শ্রমিকদের বেশিরভাগ ভোলা, বরিশাল, বাগেরহাট অঞ্চলের। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে তারা নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে খাতুনগঞ্জে বেচাকেনা কমছে। তবে বন্দরের সংকটে আমদানি করা পণ্য খালাস ব্যাহত হলে, বিশেষ করে ভোগ্যপণ্যের খালাস বিঘ্নিত হলে বাজারে দাম বাড়বে। রোজার আগের দু-এক দিন চাহিদা বেশি থাকে। সরবরাহ কম হলে দাম দ্রুত বেড়ে যাবে।”
রমজানে খেজুরের চাহিদাও সাধারণত বেশি থাকে। দেশের চাহিদার প্রায় সবটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বন্দরে অপারেশনাল কাজ বন্ধ থাকলে জাহাজ থেকে খালাস সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে পাইকারিতে প্রায় সব ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে।

