অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হতে আর হাতে গোনা কয়েকদিন। সময় দ্রুত ফুরিয়ে এলেও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি—উড়োজাহাজ ক্রয়—নিয়ে আলোচনা এখনো থেমে নেই। বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের আলোচনার প্রক্রিয়া এখনো চলমান বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
সচিবালয়ে গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তাঁর ভাষায়, ২০৩৫ সাল নাগাদ মোট ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয় নিয়েই এখন আলোচনা চলছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের বর্তমান সময়সীমার মধ্যে এই চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে কিনা—সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে যে প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, সেটি একতরফা নয়। বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে টেকনো-ইকোনমিক ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে একটি তুলনামূলক প্রস্তাব তৈরি করা হয়। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে মূল্য আলোচনা বা প্রাইস নেগোসিয়েশনের জন্য একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। এই টিম বর্তমানে বোয়িংয়ের সঙ্গে দরকষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এই আলোচনা সফলভাবে শেষ করা গেলে আলহামদুলিল্লাহ, সরকার একটি বড় প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে। কিন্তু যদি সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে আলোচনা শেষ না হয়, তাহলে দুঃখজনক হলেও এই সরকারের পক্ষে উড়োজাহাজ ক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা আরও জানান, এর আগে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সাল থেকে এই প্রক্রিয়া চলমান। বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত বছর বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুট মিলিয়ে ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছেন। অথচ আন্তর্জাতিক রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বহন করতে পেরেছে মাত্র ২০ লাখ যাত্রী। অর্থাৎ প্রায় এক থেকে দেড় কোটি যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইনসের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট হয় দেশের জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনটির সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকালে দেখা যায়, অসংখ্য বিদেশি এয়ারলাইনসের ভিড়ের মাঝে মাত্র কয়েকটি বাংলাদেশি উড়োজাহাজ। অথচ থাইল্যান্ড, জাপান কিংবা মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো—সেখানে স্থানীয় এয়ারলাইনসের আধিপত্য চোখে পড়ে, বিদেশি প্লেন তুলনামূলকভাবে কম।
তার মতে, এই বৈপরীত্যের মূল কারণ হলো বাংলাদেশের নিজস্ব যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা কম থাকা। প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকায় জাতীয় এয়ারলাইনস বাজার ধরে রাখতে পারছে না।
অর্থনৈতিক দিকটিও তুলে ধরেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের রফতানি আয় বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। সেখানে প্রস্তাবিত উড়োজাহাজ ক্রয়ের মূল্য আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এই অর্থ এককালীন পরিশোধ করতে হবে না। বরং দীর্ঘমেয়াদি পেমেন্ট শিডিউলের মাধ্যমে ১০ থেকে ২০ বছরে ধাপে ধাপে এই অর্থ পরিশোধ করা হবে। এতে বছরে আনুমানিক দেড় হাজার থেকে দুই হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হতে পারে।
শেখ বশিরউদ্দীন আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একসময় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে সেটি ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। তিনি দাবি করেন, যদি এই উড়োজাহাজ ক্রয়ের প্রস্তাবের বিষয়টি প্রকাশ্যে না আসত, তাহলে হয়তো শুল্ক আরও কমানোর সুযোগ তৈরি হতো। দুঃখজনকভাবে, বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশের চুক্তির শর্তগুলো প্রকাশ্যে চলে আসে, যা কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
তারপরও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। উপদেষ্টা জানান, ৯ তারিখ পর্যন্ত আরও শুল্ক কমানোর চেষ্টা চলছিল। তবে সেই বিষয়ে এখনই কোনো নির্দিষ্ট তথ্য তিনি প্রকাশ করতে চাননি বা পারেননি।
সব মিলিয়ে, উড়োজাহাজ ক্রয় নিয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে আলোচনা যেমন জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়সীমা এই প্রক্রিয়াকে এনে দাঁড় করিয়েছে এক অনিশ্চিত মোড়ে। শেষ পর্যন্ত এই সরকার চুক্তি সম্পন্ন করতে পারবে কিনা—সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।

