শ্রমিক–কর্মচারীদের টানা সাত দিনের ধর্মঘটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বন্দরে ভিড়ছে জটিলতা। আমদানি করা ভোগ্যপণ্য জাহাজেই আটকে থাকছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ধর্মঘটের কারণে জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো যাচ্ছে না। বন্দরের ইয়ার্ড ও জেটিতে কার্যক্রম প্রায় স্থবির। ফলে কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন রমজান মাস সামনে। আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে পবিত্র এই মাস। রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়। কিন্তু বন্দরের অচলাবস্থায় সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
তাঁদের মতে, দ্রুত পণ্য খালাস শুরু না হলে বাজারে সংকট দেখা দিতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। এতে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে ধর্মঘটের সমাধান না হলে অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হওয়ার শঙ্কা কাটছে না।
সাতদিন ধরে বন্দরের স্থবিরতা:
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। একই সঙ্গে বন্দর চেয়ারম্যানকে অপসারণসহ মোট চার দফা দাবি তোলা হয়। এই দাবিতে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ধর্মঘট পালন করা হয়। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে যান। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নৌপরিবহন উপদেষ্টার অনুরোধে ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় ৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন শ্রমিকরা। ধর্মঘটের ধারাবাহিকতায় বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, দ্রুত সমাধান না এলে বন্দরকেন্দ্রিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাব্য কারণ কী?
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চলতি বছর রমজান সামনে রেখে ভোগ্যপণ্য আমদানি ও মজুত কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল আগেভাগে। তবে শ্রমিক–কর্মচারীদের টানা সাত দিনের ধর্মঘটে সেই প্রস্তুতি কার্যত ভেঙে পড়েছে।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম ছয় দিনের ধর্মঘটে বন্দরে পণ্য ওঠানামা, খালাস ও ডেলিভারি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এতে বন্দরের ভেতরের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে রবিবার, যখন নতুন করে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়। এদিন বহির্নোঙরেও শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রাখেন। ফলে পুরো বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এই সাত দিনে কোনো ভোগ্যপণ্যই বন্দর থেকে খালাস নিতে পারেননি আমদানিকারকেরা।
ব্যবসায়ীদের আরেক দফা তথ্যে জানা গেছে, অনির্দিষ্টকালের এই কর্মবিরতির কারণে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ১১৯টি জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এর মধ্যে ২৭টি কনটেইনারবাহী এবং ২২টি খাদ্যপণ্যবাহী জাহাজ। এসব জাহাজে রয়েছে চাল, ডাল, গম, চিনি, ভোজ্যতেল, সয়াবিনসহ নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য।
বন্দরে কাজ বন্ধ থাকায় এসব জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আমদানিকারকদের বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। অপেক্ষমাণ প্রতিটি জাহাজের জন্য দৈনিক ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ডেমারেজ বা জরিমানা গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আশঙ্কা, এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোগ্যপণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারে এবং বাড়তি চাপ সামলাতে হবে ভোক্তাদেরই।
ব্যবসায়ী মহলের উৎকণ্ঠা:
রমজান সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ব্যবসায়ী মহলে। দুবাই থেকে ২২ কনটেইনার খেজুর আমদানি করছেন ব্যবসায়ী ফারুক আহমেদ। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে পণ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা। তবে জাহাজ বহির্নোঙরে পৌঁছালেও বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় খালাস নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফারুক আহমেদ বলেন, শুধু তাঁর নয়, অনেক আমদানিকারকই এখন একই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। পণ্য সময়মতো খালাস করা না গেলে রমজানের আগে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাঁর মতে, বন্দরের অচলাবস্থা দ্রুত কাটলে ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই ভোগ্যপণ্য বাজারে ছাড়তে পারতেন। এতে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকত এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেত।
এদিকে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন জানান, রবিবার ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শ্রমিক-কর্মচারীরা বহির্নোঙরেও কাজ বন্ধ রাখেন। ফলে সেখানে বাল্কপণ্য খালাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারে। পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা জরুরি।
চাক্তাই–খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, রমজান আসতে আর বেশি দিন বাকি নেই। এ সময় ছোলা, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল ও খেজুরের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি আরও জানান, বন্দরের বর্তমান সংকটের প্রভাব এখনো পুরোপুরি খাতুনগঞ্জের বাজারে পড়েনি। তবে এই অচলাবস্থা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের সমন্বিত চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ:
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ শিল্প ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করে পৃথক চিঠি দিয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ।
চিঠিতে তাঁরা উল্লেখ করেন, রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালবাহী জাহাজ খালাসে বিলম্ব হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। এতে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বন্দরে জাহাজজট ও কার্যক্রম স্থবির থাকায় আমদানিকারকদের প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ডেমারেজ চার্জ হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে বলেও চিঠিতে সতর্ক করা হয়।
অন্যদিকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সরওয়ার হোসেন বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোতে চাল, ডাল, গম, চিনি, ভোজ্যতেল ও সয়াবিনসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য রয়েছে।
রমজান মাসে এসব পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি থাকে উল্লেখ করে তিনি শ্রমিক নেতাদের বিষয়টি মানবিক ও সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার অনুরোধ জানান। তাঁর মতে, দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব শুধু ব্যবসায়ী নয়, সরাসরি ভোক্তা পর্যায়েও পড়বে।
ধর্মঘট প্রত্যাহারের আহ্বান ক্যাবের:
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে উদ্বিগ্ন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন জানান, শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের কারণে ভোগ্যপণ্যের সাপ্লাই চেইনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে। তিনি বলেন, ছোলা, ডাল, তেল, চিনি, খেজুরের মতো রমজানে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের দাম হুহু করে বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় বাজার অস্থির হয়ে পড়বে এবং মূল্য বৃদ্ধি পাবে। তাই তাঁর মতে, ধর্মঘটটি দ্রুত প্রত্যাহার করা উচিত।
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহিম খোকন। ধর্মঘটের বিষয়ে জানতে চাইলে সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর সংবাদকর্মীদের বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক বিন হারুন জানিয়েছেন, চলতি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বহুল আলোচিত চুক্তিটি কার্যকর হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আমরা এটাকে কোনো আইওয়াশ হিসেবে দেখছি না। বরং মনে করি, জাতির কল্যাণের কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ধর্মঘট চালু থাকবে কি না, তা নিয়ে আমরা বৈঠকে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।

