যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি ক্ষতি ঠেকাতে অবশেষে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। চুক্তির ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ১৯ শতাংশে নেমেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে পাল্টা শুল্ক আরোপ না করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সরকারের আশা, এতে সম্ভাব্য বড় ধরনের রপ্তানি ক্ষতি এড়ানো যাবে। তবে এ সুবিধার বিপরীতে বাংলাদেশকে মেনে নিতে হয়েছে বিস্তৃত শর্ত। শুল্ক ও অশুল্ক ছাড় থেকে শুরু করে সামরিক ও বেসামরিক ক্রয় বৃদ্ধি, এমনকি নির্দিষ্ট কিছু দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে সীমাবদ্ধতার বিষয়ও এতে যুক্ত হয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) গতকাল চুক্তির কপি প্রকাশ করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গত সোমবার রাতে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন:
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর আগে সাধারণ গড় শুল্ক ছিল সাড়ে ১৫ শতাংশ। এর সঙ্গে পাল্টা শুল্ক যোগ হয়ে মোট শুল্ক দাঁড়ায় সাড়ে ৩৪ শতাংশ। নতুন চুক্তির ফলে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮৫ থেকে ৮৬ শতাংশ পণ্য পাল্টা শুল্ক ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বিশেষ করে গার্মেন্টস খাত, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৮৬ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করলে শূন্য পাল্টা শুল্ক সুবিধা পাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তুলা আমদানিকারক দেশ। দেশের চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ তুলা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাকি ৯৮ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার বাস্তবসম্মত এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিও কমবে। চুক্তিতে একটি ‘প্রস্থান ধারা’ রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট নোটিশ দিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এ চুক্তি থেকে সরে আসতে পারবে।
পাল্টা শুল্কের পটভূমি:
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১০০টি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হার ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে তা ৩৫ শতাংশে সংশোধন করা হয়। ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফা বৈঠকের পর ৩১ জুলাই হার ২০ শতাংশে নামানো হয়। সর্বশেষ চুক্তিতে তা কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বড় অঙ্গীকার:
বর্তমানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার এবং আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। এই ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ বড় পরিসরে আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি। আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ টন গম আমদানি করা হবে। পাশাপাশি এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ টন সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য আমদানির কথা বলা হয়েছে। তুলা আমদানির বিষয়ও রয়েছে।
জ্বালানি খাতে ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বোয়িংয়ের তৈরি ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করেছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও কেনার বিকল্প রাখা হয়েছে। উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও সেবা সংগ্রহেও সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৫৫৫টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। আরও ৪০৩টি পণ্যের শুল্ক আগের মতোই শূন্য থাকবে।
বি-৫ শ্রেণির ৯৯৬টি পণ্যের শুল্ক অর্ধেক কমবে এবং পাঁচ বছরে পুরোপুরি শূন্য হবে। বি-১০ শ্রেণির ৩৪০টি পণ্যের ক্ষেত্রেও দশ বছরে ধাপে ধাপে শুল্ক শূন্যে নামানো হবে।
চুক্তিতে অশুল্ক বাধা কমানো, ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো আধুনিক করার অঙ্গীকার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোটরযান নিরাপত্তা মান, এফডিএ সনদপ্রাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা যন্ত্রের স্বীকৃতি দেওয়া হবে। পুনর্নির্মিত যন্ত্রাংশের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
শ্রম অধিকার রক্ষা, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি বন্ধ, পরিবেশ সুরক্ষা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কারণে বাজার বিকৃতি কমানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির কোনো দেশের সঙ্গে এমন নতুন চুক্তি করা যাবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সমঝোতাকে দুর্বল করে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর না হলে তারা চুক্তি বাতিল করতে পারবে।
কিছু সংবেদনশীল খাতে নির্দিষ্ট দেশ থেকে ক্রয় সীমিত রাখার বিষয়ও রয়েছে। প্রয়োজনে শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক পুনর্বহাল করতে পারবে।
চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক রপ্তানি ঝুঁকি কমালেও এর বিনিময়ে বড় আকারের আমদানি অঙ্গীকার ও নীতিগত সমন্বয় করতে হচ্ছে। গার্মেন্টস খাতের জন্য শূন্য পাল্টা শুল্ক সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালের ওপর।
অন্যদিকে কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও উড়োজাহাজ ক্রয়ের বড় প্রতিশ্রুতি দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার চাপে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করাও হবে বড় চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে চুক্তিটি একদিকে রপ্তানি সুরক্ষার কৌশল, অন্যদিকে শর্তসাপেক্ষ অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা।

