রোজার বাজারে খেজুরের গুরুত্ব আলাদা। তাই খেজুরের দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলে রোজার অন্যান্য পণ্যের কেনাকাটায়। দাম বাড়লে ক্রেতাদের খরচও বেড়ে যায়। এবার রোজা সামনে রেখে খেজুরের আমদানি বেড়েছে। দাম যাতে সহনীয় থাকে, সেই জন্য আমদানি শুল্কও কমানো হয়েছে। বন্দর দিয়ে আমদানি করা খেজুর নিয়মিত খালাসও হচ্ছে। তবুও খুচরা বাজারে পাঁচ ধরনের খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে জাহিদি খেজুর। তুলনামূলক কম দামের কারণে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের কাছে এটি জনপ্রিয়। অনেকেই এটিকে ‘গরিবের খেজুর’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। দেশে জাহিদি খেজুর আমদানিও সবচেয়ে বেশি। এবার রোজার শুরুতে জাহিদি খেজুরের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। শুধু জাহিদিই নয়, দাব্বাস, নাকাল, মাশরুখ ও আম্বর—এই পাঁচ ধরনের খেজুরের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত।
জাহিদি খেজুর মূলত ইরাক থেকে দুবাই হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। সেখান থেকে পাইকারি বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। কার্টন ও বস্তা—দুইভাবে বিক্রি হয়। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে কার্টন হিসেবে প্রতি কেজি জাহিদি খেজুর বিক্রি হয়েছে ২৮০ টাকায়, খুচরায় দাম ছিল ৩৫০ টাকা। গত বছর রোজার শুরুতে খুচরায় প্রতি কেজি জাহিদি খেজুরের দাম ছিল ২০০ টাকা। বস্তা হিসেবে বিক্রি হওয়া প্রতি কেজি খেজুরের দাম ছিল ১৯০ টাকা, খুচরায় তা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা বিক্রি হয়। গত বছর খুচরায় এই দাম ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা।
বাজার ও আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। সম্প্রতি থাইল্যান্ড থেকে আসা একটি জাহাজে থাকা প্রায় চার হাজার টন খেজুর সাগরে ডুবে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে বড় চালান আসতে না পারায়। ডুবে যাওয়া খেজুরের প্রায় ৯০ শতাংশই জাহিদি। এছাড়া বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ইজারার প্রতিবাদে কর্মবিরতি হওয়ার কারণে কয়েক দিন পণ্য খালাস বন্ধ ছিল।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সরবরাহে সাময়িক ঘাটতির কারণে জাহিদি খেজুরের দাম বেড়েছে। বন্দর এখন স্বাভাবিক, নতুন চালান আসছে। তিনি আশা করেন এক সপ্তাহের মধ্যে দাম কমে যাবে।
আমদানি বেড়েছে ১১ শতাংশ:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খেজুর আমদানি হয়েছে ৪৯ হাজার ৮০৭ টন। গত বছর একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৪৪ হাজার ৭১৬ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৫ হাজার ৯১ টন বা ১১.৪ শতাংশ।
দায়িত্ব ছাড়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকার রোজায় খেজুরের সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্বাভাবিক রাখার জন্য আমদানিতে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২৪ ডিসেম্বর খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এটি ৩১ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর। ২০২৪ সালেও শুল্ক একইভাবে কমানো হয়েছিল। তখনও আমদানি বাড়ার সঙ্গে দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল।
ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, রোজায় খেজুরের মোট চাহিদা প্রায় ৬০ হাজার টন। বর্তমানে আমদানির গতিকে দেখে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ চাহিদা ছাড়িয়ে যাবে। শুধু ১৫ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি—তিন দিনেই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হয়েছে ৬ হাজার ৯১৭ টন খেজুর। এনবিআরের হিসাবে, চলতি মৌসুমে আমদানিকৃত খেজুরের প্রায় ৩০ শতাংশই জাহিদি, যা প্রায় ১৫ হাজার টন।
খেজুর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আল্লাহর রহমত স্টোরের কর্ণধার মো. কামাল বলেন, জাহাজ ডুবে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ জাহিদি বাজারে আসতে পারেনি। ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিক বিকল্প উৎস থেকে জাহিদি সংগ্রহ করেছেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তা বাজারে আসবে। তখন দামও কমে যাবে।
খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফারুক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার ফারুক আহমেদ বলেন, শুল্ক ও কর কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার নমনীয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি করতে পারছেন। সরবরাহের ঘাটতি শিগগিরই কাটবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোজায় খেজুরের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। সরবরাহে সামান্য বিলম্ব হলে বাজারে তার প্রভাব পড়ে। পাইকারি পর্যায়ে সামান্য মূল্যবৃদ্ধি খুচরায় আরও বেড়ে যায়। তাই আমদানির খরচ কমলেও সেই সুবিধা সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায় না। বাজারে পর্যাপ্ত তদারকির অভাবকেও দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখানো হয়।
দাম কত বেড়েছে:
মান ও জাত অনুযায়ী খেজুরের দাম ভিন্ন। চট্টগ্রামের স্টেশন রোডের ফলমন্ডিতে নাকাল খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ টাকায়, গত বছর ছিল ২৮০। মাশরুখ বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকায়, গত বছর ৪০০। একই বাজারে আম্বর বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়, গত বছর ৬০০। দাব্বাস এবার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, গত বছর ৪০০। তবে আজোয়া, মেডজুল ও মরিয়মের মতো খেজুরের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে পাঁচ কেজি কার্টন জাহিদি খেজুর কিনেছেন ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। তিনি বলেন, রোজায় প্রতিদিনই খেজুর লাগে। দাম বাড়লেও কিনতে হয়।
ফ্রেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ডেটসের কর্ণধার মো. শফিউল আজম বলেন, পাইকারিতে বেশির ভাগ খেজুরের দাম স্থিতিশীল। তবে জাহিদি ও দাব্বাস জাতের দাম কিছুটা বেড়েছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার থেকে দেশের অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে খেজুর বিক্রি শুরু করেছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ। তারা ১৬০ টাকা কেজি দরে খেজুর বিক্রি করছে। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ আধা কেজি কিনতে পারবেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক সজীব কুমার ঘোষ বলেন, খেজুর এখন শুধু রোজাভিত্তিক পণ্য নয়। সারা বছরই এর স্থিতিশীল চাহিদা আছে। তবে রোজা এলেই চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। সরবরাহ ঠিক না থাকলে সামান্য ঘাটতিও বাজারে দাম বাড়ানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

