“আপনার মেয়াদ শুরুর এই সময়ে আমি আশা করি, আমাদের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্কের গতি ধরে রাখতে আপনি আমাকে সহায়তা করবেন। এই চুক্তির ফলে আমাদের উভয় দেশের কৃষক ও শ্রমিকেরা সুবিধা পাবেন।”
প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই কথা উল্লেখ করেছেন এক চিঠিতে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে এই চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষর হওয়ায় তা নিয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের ঠিক আগে কেন এই চুক্তি স্বাক্ষর করা হলো?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা প্রায় নয় মাস ধরে চলছিল। তবে গোপনীয়তার শর্তে তখন বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। চুক্তি প্রকাশের পর বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলছেন, চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
চুক্তির খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার বদলে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে আমেরিকার চাহিদাকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্বাচিত সরকারের উচিত এই চুক্তি পরীক্ষা করা।
গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২রা এপ্রিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বিভিন্ন হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫ শতাংশ।
সেসময় বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। পরে শুল্ক হার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানো হয়।
তবে চূড়ান্ত শুল্ক নির্ধারণের জন্য দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে। গত নয় মাস ধরে বিভিন্ন বৈঠক ও ধারাবাহিক আলোচনার পর দরকষাকষি শেষে উভয় পক্ষ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। নতুন চুক্তির পর বাংলাদেশের ওপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশে এসেছে।
চুক্তিতে উভয় দেশের বিভিন্ন পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষকরা দেখছেন, বাংলাদেশের নেগোসিয়েশনেই ‘দুর্বলতা’ রয়েছে।

বাণিজ্য চুক্তি কার পক্ষে হলো?
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের। বাংলাদেশ সেখানে বেশি রপ্তানি করে, কম আমদানি।
ডলারে দেখলে, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বিপরীতে আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য কেনে।
ফলে দেশটি বাংলাদেশকে আরও কেনাকাটা বাড়াতে চাপ দেয়। শাস্তিমূলক শুল্কও আরোপ করে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে চুক্তি। এভাবে আমেরিকা ১০০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে এমন চুক্তি করেছে বা করতে যাচ্ছে।
তবে চুক্তিতে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের তুলনায় আমেরিকা বেশি লাভবান হয়েছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, “চুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব স্পষ্ট। তারা কী করবে, আমরা কী করবো—এর চেয়ে চারগুণ বেশি বাধ্যতামূলক ক্লজ আছে। সাধারণভাবেও বোঝা যায়, চুক্তি তাদের পক্ষে হয়েছে।”
তাহলে এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কী অর্জন করলো?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান তৈরি পোশাক খাতের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “চুক্তির পেছনে সরকার মূলত রাজনৈতিক অর্জন বেশি চেয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকান রাজনৈতিক অনুগ্রহ অর্জন। অর্থনৈতিক অনুগ্রহের বদলে রাজনৈতিক সমর্থন। গার্মেন্টস সেক্টর রক্ষা করা এখানে প্রধান সুবিধা।”
অধ্যাপক হাসান আরও বলেন, “অন্যদিকে আমেরিকা তাদের রাজনৈতিক সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সুবিধাও নিশ্চিত করেছে।”
চুক্তির কোন বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন?
চুক্তির শেষের দিকে ‘সেকশন ছয়’ এ কমার্শিয়াল কনসিডারেশন উল্লেখ আছে। এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আমেরিকান পণ্য কেনাকাটার পরিকল্পনা দেখানো হয়েছে।
বিবরণ অনুযায়ী:
- বাংলাদেশ আমেরিকা থেকে ১৪টি বোয়িং বিমান কিনবে
- ১৫ বছরে জ্বালানি কিনবে ১৫০০ কোটি ডলারের
- বছরে কৃষিপণ্য আমদানি করবে ৩৫০ কোটি ডলারের
প্রশ্ন ওঠে, এসব কেনাকাটা শুধু ক্রয় বাড়ানোর জন্য নাকি প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে?
অধ্যাপক হাসান বলেন, “বিমানগুলো বাংলাদেশের প্রয়োজন আছে কি না আমরা জানি না। এগুলো আনার পর আমাদের এয়ারলাইন্স কি লসের দিকে যাবে? এ বিষয়গুলো ভাবতে হবে।”
মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, “সংখ্যা ধরে কেনা হলে ঝুঁকি থাকে। যদি পরে প্রয়োজন না হয়, তখন ক্রয় পেছানো কঠিন হয়ে যাবে। ফলস্বরূপ পাল্টা শুল্ক আবার বাড়তে পারে।”
চুক্তিতে অন্য একটি দুর্বলতা, সরকারি ক্রয়ের পাশাপাশি কৃষি পণ্য, তুলা, তেল বেসরকারি কোম্পানি থেকে আমদানি হবে।

অন্যদিকে এভাবে সংখ্যা বা অংক ধরে কেনার কথা বলায় ঝুঁকি দেখতে পান সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তিাফিজুর রহমান।
“এগুলো একবারে কংক্রিট নাম্বার দিয়ে বলা হয়েছে। আবার পরে কোনো সময় যদি প্রয়োজন দেখা দেয় তখন এসব ক্রয় পেছানো দুস্কর হয়ে যাবে। তখন পেছাতে গেলেই বলবে যে তাহলে আবার পাল্টা শুল্ক যেটা প্রথমে দেওয়া হয়েছিলো ৩৭ শতাংশ, সেখানে নিয়ে যাবো।”
এছাড়া নেগোসিয়েশনে আরেকটি দুর্বলতা তারা উল্লেখ করেছেন যে, বিমান কিংবা গমের মতো আমদানিগুলো সরকারিভাবে করা হলেও অন্যান্য কৃষিপণ্য, তুলা, তেল এসব আমদানি হবে বেসরকারিভাবে। অর্থাৎ এগুলো আমদানি করবে বেসরকারি কোম্পানিগুলো।
কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি কোম্পানিগুলো যেখানে ভারত, পাকিস্তান কিংবা চীন থেকে অল্প সময়ে কম খরচে আমদানি করতে পারে সেখানে আমেরিকা থেকে আনতে গেলে খরচ এবং সময় বাড়বে।
“কোম্পানিগুলো তো সরকারের আমদানি ঘাটতি মেটাতে নিজেদের আর্থিক ক্ষতি করে ভারত বা পাকিস্তানের পরিবর্তে আমেরিকা থেকে আনতে যাবে না। অথবা সেটা করতে গেলে সরকারের কাছে বাড়তি কোনো সুবিধা বা ভর্তুকি চাইতে পারে। সরকার কি চুক্তির সময় এই কস্টিং করেছে?” বলেন মোস্তাফিজুর রহমান।
ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন হতে পারে:
চুক্তিতে দুই দেশই অনেক পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৬৭১০টি পণ্য, বাংলাদেশের ১৬৩৮টি পণ্য।
ধাপে ধাপে আরও অনেক পণ্য শুল্কমুক্ত হবে। তবে এতে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় কমবে।
চুক্তির শেষাংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আমেরিকা থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়াবে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে কেনাকাটা সীমিত করবে। কোন দেশ থেকে কমাতে হবে তা উল্লেখ নেই। বর্তমানে চীন মূল সরবরাহকারী।

চতুর্থ সেকশনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছে এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনা যাবে না। তবে বিদ্যমান প্রকল্প বা বিকল্প না থাকলে ব্যতিক্রম আছে।
ফলে চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক চাপে পড়তে পারে। এছাড়া স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও কমে যাবে।
অধ্যাপক হাসান বলেন, “আমাদের ডিফেন্স এখন তাদের সিস্টেমের সঙ্গে ইন্টিগ্রেট। এর বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা কম।”
চুক্তির অন্য শর্তে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন সীমান্ত ব্যবস্থা নিয়ে পদক্ষেপ নেবে, বাংলাদেশও তা অনুসরণ করবে।
আর যদি তৃতীয় দেশের কোম্পানি বাংলাদেশে কমদামে পণ্য বিক্রি করে, মার্কিন স্বার্থের ক্ষতি হলে বাংলাদেশকেও পদক্ষেপ নিতে হবে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এতে চীনের সঙ্গে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ ব্যবসায়ীরা চীনের পণ্য কমদামে কিনবে।”
এমন চুক্তি কেন করা হলো?
চুক্তিতে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, ই-কমার্স ও মেধাসত্ত্ব সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে। অধ্যাপক হাসান বলছেন, এতে বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমেরিকার চালাকি হলো পাল্টা শুল্কের মাধ্যমে তাদের প্রশাসনিক এবং আইনি সিস্টেম আমাদের ওপর চাপানো। টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড, মেধাস্বত্ত্ব ব্যবহার করে তারা আমাদের উপরে উঠে গেছে। আমরা তাদের পণ্যে বাধা দিতে পারব না, তারা আমাদের পণ্যে বাধা দিতে পারবে।”
সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, চুক্তি বাণিজ্য ছাড়াও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে কমে গেছে। তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে। এতে বাংলাদেশের পোশাক কম দামে মার্কিন বাজারে যাবে।”

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাল্টা শুল্ক কমেছে, তৈরি পোশাক বাজার ঠিক আছে, কিন্তু ছাড় দিতে গিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা কিনতে খরচ বেশি হলে শূন্য শুল্কের সুবিধা কমে যাবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দেশের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সম্পর্ক জড়িত এই চুক্তি কেন শেষ সময়ে স্বাক্ষর হলো? নির্বাচিত নতুন সরকারের জন্য কেন রাখা হলো না?
চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এখন প্রশ্ন, নবগঠিত বিএনপি সরকার কী করবে। নতুন সরকারের কেউ আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বিএনপির নতুন সরকারেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। চুক্তি থেকে সরে আসার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশের পক্ষে তা করা কঠিন হবে। নতুন সরকার এখনই ঝুঁকি নেবে কি না, তা দেখতে হবে।
সূত্র: বিবিসি

