যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হ্রাসে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা হয়েছে, তবে নতুন অর্ডারের অনিশ্চয়তা রপ্তানি প্রবাহকে থমকে দিয়েছে।
বাংলাদেশি রপ্তানিকারীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা এখনো স্থগিত রাখছেন নতুন অর্ডার। কারণ, মাত্র পাঁচ মাসের জন্য ঘোষণা করা ১৫ শতাংশ শুল্কের ভবিষ্যৎ স্পষ্ট নয়—বাতিল হবে নাকি পুনরায় বাড়ানো হবে, তা জানা যায়নি। এই অনিশ্চয়তা মার্কিন ক্রেতাদের মধ্যে দ্বিধার সৃষ্টি করেছে।
এছাড়া, উৎপাদন বা প্রক্রিয়াধীন পণ্যের জন্য কিছু ক্রেতা ইতিমধ্যেই ২ শতাংশ অতিরিক্ত মূল্যছাড় দাবি করছেন। রপ্তানিকারকরা বলছেন, এটি আগেই সংকুচিত মুনাফা আরও ক্ষতিগ্রস্ত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। শুল্কের এই দোদুল্যমান অবস্থার কারণে দেশের রপ্তানি প্রবাহে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নতুন অর্ডারের স্থগিতাবস্থা ও দরকষাকষির চাপ বাজারে অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।
ক্রেতারা সিদ্ধান্তে দ্বিধাগ্রস্ত:
বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, দ্রুত পরিবর্তিত মার্কিন বাণিজ্য নীতি ক্রেতাদের “অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ” অবস্থায় রাখছে। অন্তত আটজন রপ্তানিকারক জানিয়েছেন, ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্পষ্ট দ্বিধা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্পষ্টতা ছাড়া নতুন অর্ডারের প্রবাহ স্বাভাবিক হবে না। অর্থাৎ, মার্কিন শুল্ক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগ পর্যন্ত ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি পাবে না।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বায়াররা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা অপেক্ষা করছে ফাইনালি ট্যারিফ রেট কী হবে। কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা তাদের জন্য অসম্ভব।”
স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম খালেদও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র সরকার নতুন করে যে ট্যারিফ আরোপ করেছে, তা পাঁচ মাস বা ১৫০ দিনের জন্য। ইতিমধ্যেই আমাদের কিছু অর্ডার রয়েছে, যা আগামী জুন পর্যন্ত। কিন্তু পাঁচ মাস পর নতুন ট্যারিফ থাকবে কি-না, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে।” খালেদ জানান, “এ কারণে বায়াররা ক্রয়াদেশ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।” উল্লেখ্য, তার কোম্পানির বার্ষিক রপ্তানির ২০ শতাংশ মার্কিন বাজারে যায়, যা ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও পরিস্থিতিকে “অনির্দেশ্য” আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “চূড়ান্তভাবে শুল্ক হার কোথায় দাঁড়াবে, তা নিয়ে ক্রেতারা অন্ধকারে আছেন।” তার মতে, ক্রেতারা এখন ন্যূনতম পরিমাণ অর্ডার দিচ্ছেন। এই প্রবণতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের পোশাক রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাণিজ্য সংকটে শুল্কের অস্থিতিশীলতা:
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির থেমে-থেমে পরিবর্তন রপ্তানির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান জানান, “যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ব্যবস্থায় আইনি দোলাচল পরিস্থিতি জটিল করেছে। একদিকে সুপ্রিম কোর্ট রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বাতিল করেছে, অন্যদিকে ট্রাম্প নতুন আইনের মাধ্যমে নতুন ট্যারিফ আরোপ করেছেন। তার হাতে আরও ক্ষমতা আছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পণ্য বা দেশের উপর বাড়তি ট্যারিফ দিতে পারেন। ফলে কখন কোন পণ্যে বা দেশের উপর নতুন শুল্ক বসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বায়াররা তাই প্রয়োজন না হলে অর্ডার স্থগিত রাখছেন।”
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় পোশাক বাজার। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি দাঁড়িয়েছে ৮.১৮ বিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট বৈশ্বিক পোশাক আমদানির ১১ শতাংশ।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছিল। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এখন নতুন করে প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ ট্যারিফ সব দেশের জন্য প্রযোজ্য হলে, রপ্তানিকারকরা মনে করছেন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবে। অর্থাৎ, আগে থাকা তুলনামূলক সুবিধা হারাবে।
স্নোটেক্স গ্রুপের এস এম খালেদ বলেন, “আগের শুল্ক কাঠামোয় চীন ও ভারতের ট্যারিফ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ছিল। ফলে চীনের কিছু অর্ডার বাংলাদেশে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সমান হারে ট্যারিফ হলে সেই সুবিধা আর থাকবে না। এটি আমাদের রপ্তানিতে চাপ তৈরি করবে।”
ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চীনের রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে ৩৪ শতাংশ কমেছিল, একই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছিল ১২ শতাংশ। এছাড়া প্রধান অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর রপ্তানি সাধারণত বেড়েছে। রপ্তানিকারকরা সতর্ক করছেন, সমান শুল্ক ব্যবস্থা চালু হলে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে বাংলাদেশি রপ্তানি প্রবণতা উল্টে যেতে পারে।
ক্রেতাদের চাপের মুখে বায়িং হাউস:
২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে শুল্ক কমার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা বিদ্যমান অর্ডারের ওপর নতুন করে দরকষাকষি শুরু করেছেন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যম সারির একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ঢাকায় অবস্থিত বায়িং হাউজকে ইতিমধ্যেই ২ শতাংশ মূল্যে ছাড় চেয়েছে। সাম্প্রতিক শুল্ক পরিবর্তনের কারণে কাস্টমস ক্লিয়ার না হওয়া পণ্যের ডিডিপি (ডেলিভারি ডিউটি প্রাইস) মূল্যে ২ শতাংশ সমন্বয় প্রয়োজন।”
ঢাকা-ভিত্তিক একটি বায়িং হাউজের সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সাপ্লায়ারের কাছ থেকে পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ নেই। যা কমাতে হবে, সেটি আমাদেরই ম্যানেজ করতে হবে।” তার প্রতিষ্ঠান থেকে ৯০ শতাংশ চালান যুক্তরাষ্ট্রে যায়। অন্য একাধিক বায়িং হাউজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ঘোষণা শনিবার আসার কারণে রবিবার বন্ধ থাকায় দরকষাকষির চাপ নতুন কর্মসপ্তাহে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সতর্ক করেছেন, আরও অনেক ক্রেতা একই পথে হাঁটতে পারেন। রপ্তানিকারকরা দাবি করছেন, ৫ শতাংশ পয়েন্ট শুল্ক হ্রাসের পুরো সুবিধা রিটেইলাররা এককভাবে নিতে পারবেন না। শুল্ক কমার আগে প্রস্তুতকারকরা ইতিমধ্যেই মূল্য কমিয়ে রেখেছেন, তাই শুল্ক হ্রাসের সুবিধায় তাদেরও অংশ থাকা উচিত।
স্প্যারো গ্রুপের শোভন ইসলাম বলেন, তার গ্রুপ ক্রেতাদের কাছ থেকে অন্তত ১ শতাংশ সাশ্রয় দাবি করবে। তবে খালেদ উল্লেখ করেন, “কম শুল্কের পুরো সুবিধা ক্রেতারা নিজেদের পকেটে নিচ্ছেন, আমাদের কোনো ছাড় দিচ্ছেন না।” এ মুহূর্তে ওয়াশিংটনের নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারের মূল্যচাপের মধ্যে আটকে রয়েছে বাংলাদেশের পোশাক খাত। রপ্তানিকারকেরা এমন এক স্পষ্টতার অপেক্ষায় রয়েছেন, যা শিগগিরই নাও আসতে পারে।

