রমজান এলেই বাজারে খেজুরের চাহিদা বাড়ে—এ যেন চিরচেনা দৃশ্য। কিন্তু চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দামও যখন বাড়তে থাকে, তখন ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ ক্রেতারা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং পরিসংখ্যান বলছে, খেজুর আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, শুল্কও কমানো হয়েছে। তবুও বাজারে দামের চাপ কমেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে খেজুর আমদানি হয়েছিল ৩ হাজার ১৮৪ মেট্রিক টন। আর ২০২৫ সালের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১৯২ শতাংশ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ১ নভেম্বর থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে এসেছে ৪৯ হাজার ৮০৭ টন খেজুর। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৪৪ হাজার ৭১৬ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে পাঁচ হাজার ৯১ টন বা ১১.৪ শতাংশ।
সরকারি হিসাবে বছরে খেজুরের মোট চাহিদা ৯০ হাজার থেকে এক লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে শুধু রোজাতেই প্রয়োজন হয় প্রায় ৬৫ হাজার টন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রোজার চাহিদার তুলনায় ইতোমধ্যে ১৫ হাজার টন বেশি খেজুর আমদানি করা হয়েছে।
রমজান সামনে রেখে ২৩ ডিসেম্বর খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়, যা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে ব্যবসায়ীরা জানান, শুল্ক ছাড়ের প্রজ্ঞাপন জারি হলেও তার সুবিধা পেতে প্রায় এক মাস সময় লেগেছে। এর আগেই অনেক আমদানিকারক উচ্চ শুল্কে পণ্য খালাস করেছেন, যার প্রভাব পড়েছে দামে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, রমজানকে মাথায় রেখে পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ভিড়তে কোনো বড় জট ছিল না। ফলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির প্রশ্ন নেই।
তবে আমদানিতে সরাসরি যুক্ত কয়েকজন ব্যবসায়ী বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের টানা শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। ফলে প্রায় ১৫ দিনের একটি গ্যাপ তৈরি হয়, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ে।
বাদামতলী বাজারের ফল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মোল্লা ফ্রেশ ফোর্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আল-আমিন বলেন, বন্দরের অস্থিরতার কারণেই সময়মতো খেজুর খালাস করা যায়নি। তার মতে, বন্দর স্বাভাবিকভাবে চালু থাকলে বাজারে সংকট তৈরি হতো না।
খুচরা ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়াননি; বরং বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে যে দামে খেজুর বিক্রি হচ্ছে, অন্যান্য খুচরা বাজারে তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারে প্রতি কেজি দাবাস ও বরই খেজুর মানভেদে ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় এই দাম আরও বেশি বলে ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি হয়েছে। তার মতে, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে মূল্যবৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—যখন আমদানি বেড়েছে ১৯২ শতাংশ, শুল্ক কমানো হয়েছে, চাহিদার তুলনায় বেশি পণ্য এসেছে—তখনও কেন দামে স্বস্তি নেই? বন্দর ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ চেইন নাকি বাজারের অদৃশ্য হাত—কোনটি আসল কারণ, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রমজানে ইফতারের টেবিলে খেজুর রাখা ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই দাম নিয়ে এই অস্বস্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়, আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।

